1. isbn 979-8-88572-522-4
Page 1
পরমপূজ্য পরমহংস নিত্যানন্দ
কেন দুঃখকষ্ট
Page 2
Published by:
NITHYANANDA UNIVERSITYPRESS
Ebook © 2016
Ebook ISBN: 979-8-88572-522-4
First Print Edition ©2016
ISBN:
Printed in India at:
প্রকাশক : নিত্যানন্দ ইউনিভার্সিটি প্রেস
সর্বসত্ব সংরক্ষিত। প্রকাশকের লিখিত অনুমতি বিনা এই প্রকাশনের কোন অংশ কোন রিট্রিভাল সিস্টেমে সংরক্ষণ বা নকল করা চলবে না অথবা ইলেকট্রনিক, মেকানিকাল, ফোটোকপি, রেকর্ডিং বা অন্য কোনরূপে হস্তান্তর করা চলবে না। এই পুস্তক বিক্রি থেকে আয়ের কিছু অংশ দাতব্য কার্যকলাপে সহায়তা করা হবে।
পরমপূজ্য পরমহংস নিত্যানন্দ
কেন দুঃখকষ্ট
Page 3
সূচীপত্র
আমরা কেন দুঃখকষ্ট পাই? 3
দুঃখকষ্টের কারণ কি? 5
প্রতিটি যুগে যেমন, ঠিক তেমনটি স্বীকার করে জীবিত থাক 6
কষ্টভোগ হল তোমার প্রত্যক্ষকরণ 7
- প্রক্রিয়া : বারংবার 'যা যেভাবে আছে'-তে ফিরে আসা 8
তুমিই সম্পূর্ণরূপে দায়ী 10
দুঃখকষ্টকে ভর করে তোমার অমিত বৃদ্ধি হয় 13
তুমি তোমার জীবনকে দুঃখকষ্ট দিয়ে মাপ 14
তুমি ভাব যে দুঃখকষ্ট তোমাকে অসাধারণ বানায় 16
দুঃখকষ্ট এক নেশা হয়ে যেতে পারে 20
প্রয়োজনীয় দুঃখকষ্ট 21
দুঃখকষ্টের অভ্যন্তরে অন্তর্দৃষ্টি 23
বেদনা একটি অসত্য 24
তোমার অতীতই এক দুঃখকষ্ট 25
দুঃখকষ্টের পছন্দে বিজ্ঞান 26
-
দুঃখকষ্ট হল আকাশ ও সময়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব 27
-
তুমি কি উখানের জন্য প্রস্তুত? 28
-
তোমার চিপস্ন তোমার প্রকৃতিকে ব্যাক্ত করে 29
-
শূলে শানিকরন থেকে দুঃখকষ্ট আসে 30
-
প্রক্রিয়া : দৃষ্টির আকাশে বিরাজমান থাক 31
দুঃখকষ্ট অতিক্রম করা 32
দুঃখকষ্ট ও রোগ 32
দুঃখকষ্ট অতিক্রম করার নয়টি উপায় 34
১) এক বলিষ্ঠ মন্ত্র নির্ধারণ করে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর 34
- প্রক্রিয়া : তোমার শিশকে এক বলিষ্ঠ মন্ত্র উপহার দাও 34
২) বিপরীত এনগ্রাম (সংস্কার) সৃষ্টি করে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর 35
৩) সঠিক প্রত্যক্ষকরন দ্বারা দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর 36
৮) সম্পূর্তি দ্বারা দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর 38
৯) শ্বাসার মাধ্যমে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর 41
- প্রক্রিয়া : শ্বাসা সংরোজন কর 43
৬) দায়িত্বের মাধ্যমে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর 44
৭) সমর্পকরনের মাধ্যমে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর 46
- অহংতের আকাশ থেকে সমর্পণ কর 48
৮) ত্যাগের মাধ্যমে দুঃখকষ্ট অতিক্রম করা 49
- প্রক্রিয়া : বিশ্বের দুঃখকষ্টকে শ্বাসের সাথে ভিতরে নাও 50
৯) পূর্ততের মাধ্যমে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর 52
পূর্ততের তিনটি প্রক্রিয়া 54
১) স্ব-পূর্তত ক্রিয়া : নিজের সাথে পূর্তত করার প্রক্রিয়া 54
২) পূর্ততু ক্রিয়া : অপরের সাথে পূর্তত করার প্রক্রিয়া 56
৩) সংস্কার দহন ক্রিয়া : সমস্ত অপূর্ণতা দগ্ধ করার প্রক্রিয়া 57
দুঃখকষ্টের কোন মূল্যই নেই 62
তোমার দুঃখকষ্টকে ফেলে দেওয়ার চার উপায় 65
১) স্বতঃস্ফূর্ত পূর্ততু 65
২) দুঃখকষ্টকে 'না' বল 66
- প্রক্রিয়া : দুঃখকষ্টকে না বল 68
৩) মূল দুঃখকষ্টের গভীরে যাও 69
- আঁধার রাত (ডার্ক নাইট অফ দ্যা সোল) 70
৪) সঠিক অবগতি কর 72
দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তি : আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা 74
দুঃখকষ্ট সম্পর্কে মহাজাগতিক সত্য 78
- পরমপূজ্য পরমহংস নিত্যানন্দ দ্বারা জন্ম সংক্রে আকাশিক লেখন পাঠ থেকে কিছু অংশ
Page 4
আমরা কেন দুঃখকষ্ট পাই?
জীবনে আমরা প্রায় সবাই কোন না কোন সময়ে দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে গেছি।
এখন যদি আমি তোমাদের জিজ্ঞাসা করি, “তুমি কষ্টভোগ করা কেন বেছে নিলে? তোমার কষ্ট পাওয়া কি প্রয়োজন ছিল?”
তুমি নিশ্চয় সেটাকে একটা উন্ট্ট প্রশ্ন ভাববে।
‘কেউ কখনও কষ্ট পাওয়াকে বেছে নেয় নাকি?’ তোমরা আমাকে প্রশ্ন করবে। ‘দুঃখকষ্ট আমাদের সাথে ঘটে, ব্যস। আমাদের কিছুই করার নেই!’
কিন্তু সত্য হল, দুঃখকষ্ট এক পছন্দ (চয়েস)! আমি যদি বলি তোমার দুঃখকষ্ট হল কারনিক, তাহলে যেন অন্যায় ও অসহ্য বলে হওয়া হবে, কারন তোমার দুঃখকষ্ট তোমার কাছে তো বাস্তব।
দুঃখকষ্টে না ভোগার বিকল্প তো তুমি নিজেকে কখনও প্রদান কর নি।
কোনও বিকল্প আছে বলে তুমি তো জানতেও না।
দয়া করে বোঝ : দুঃখকষ্ট জীবনের অবস্থা নয়; সেটা হল মনের অবস্থা।
সেটা এক অন্তঃস্থ ঘটনা, বহিঃস্থ ঘটনা নয়!
কোন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তুমি কষ্ট পাও কি না পাও, তা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে তুমি সেই পরিস্থিতিকে কিভাবে বেছে নাও।
কিন্তু এখন প্রশ্নটির দিকে সচেতনভাবে তাকাও :
2
Page 5
আমাদের দুঃখকষ্ট কখন হয়? তুমি কখন অসুস্থ হও? তোমার প্রতিবেশী কখন একটা নতুন গাড়ি পায়? কখন তোমার সাথে অন্য কারো কাচে যাবার জন্য তোমাকে ছেড়ে যায়? এখন ধর তুমি নির্বয় নিলে, কোন ক্রোধ বা প্রতিশোধ বিনা এই পরিস্থিতিগুলিকে মেনে নেবে। তুমি কি একইভাবে কষ্ট পাবে? আর যাই হোক, তোমার প্রতিবেশী নতুন গাড়ি নিলে তাতে তো প্রকৃতপক্ষে আঘাত পাবার কিছুই নেই!
প্রিয়জন দেহত্যাগ করার অর্থাৎ চলে যাবার মুহূর্তটিতে যদিও বেদনা থাকে, তুমি তো সেটাকে পাল্টাতে পার না। প্রতিরোধ করার পরিবর্তে মুহূর্তটিকে স্বীকার করে নিলে, তুমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুঃখকষ্টের মাত্রা কমিয়ে ফেল।
দুঃখকষ্ট সর্বদা, সর্বদাই বর্তমান মুহূর্তকে বাধা দিলে জন্ম নেয়! যখন তুমি বাধা দেওয়া বন্ধ কর, দুঃখকষ্ট বন্ধ হয়! একটা ছোট গল্প : এক ব্যক্তি তিনতলার জানালা থেকে নীচে গড়ে গেল এবং দৈবক্রমে বেঁচে গেল। তাকে এক বস্তু হাসপাতালে দেখতে গেল। 'পড়তে কি খুব ব্যথা লেগেছে?' বস্তুটি বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করে। ব্যক্তিটি উত্তর দিল, 'ও, না না! পড়ার সময় কোন ব্যথাই লেগে নি। মাটি ছোঁয়াতে ব্যথা লাগল!'
যতক্ষণ তুমি প্রবাহের সাথে যাও, কোন বেদনা, কোন দুঃখকষ্ট থাকে না। যখন জীবনের পথে তোমার ধারণা ও প্রত্যাশা রাখ, তুমি সেই প্রবাহে বাধা সৃষ্টি কর। আর প্রায়শ, বেদনা এড়াবার জন্য তুমি যে প্রতিরোধ খাড়া কর , তা ঘটনাটির থেকেও বেশী কষ্ট প্রদান করে!
দুঃখকষ্টের কারণ কি? আমি বলতে পারি, দুঃখকষ্টের কারণ খোঁজাই দুঃখকষ্টের কারণ!
যতক্ষণ চিন্তা কর যে তোমার বাইরে কিছু আছে যা তোমার দুঃখকষ্টের জন্য দায়ী, তুমি দুঃখকষ্ট পেতেই থাকবে। বড় জোর, সেইগুলিই তোমার দুঃখকষ্টের যুক্তি অথবা অজুহাত হতে পারে, কিন্তু নিশ্চিত সেগুলি তোমার দুঃখকষ্টের কারণ হতে পারে না। একটা দরকারী জিনিষ তোমাকে বুঝতে হবে, বেদনা অনিবার্য হলেও, বেদনা থেকে যে দুঃখকষ্টের উদয় হয় তা অনিবার্য নয়। উদাহরণস্বরূপ, কোথাও আঘাত পেলে, সেখানে তো বেদনা হবেই, কিন্তু সেই ব্যথা থেকে কতটা দুঃখকষ্ট পেতে হবে তা তো তোমারই বেছে নেওয়ার কাজ।
Page 6
এটা এক মনোভাবের ব্যাপার! বেদনা হয়ত অনিবার্য, কিন্তু দুঃখ পাওয়া তোমারই বেছে নেওয়ার কাজ। দুঃখকষ্ট জীবনের অবস্থা নয়, সেটা মনের অবস্থা। সেটা তোমার জীবনের ঘটনা নয়, সেটা ঘটনাতে তোমার সাড়া দেওয়া।
প্রতিটি মুহূর্ত যেমন, ঠিক তেমনটি স্বীকার করে জীবনযাপন কর
বুদ্ধ 'তথ্যাত' শব্দটি ব্যবহার করেন - যেভাবে আছে ঠিক সেভাবে দেখা। যেভাবে আছে সেভাবেই দেখা - কোন রায় বা বিচার বিনা।
কিন্তু বেশীরভাগ সময়ে, আমরা জিনিষগুলিকে কেবল আমাদের বেদনার ফিল্টারের (ছাকনি) মধ্য দিয়ে দেখি। যখন সবকিছু যেমন আছে তেমনটি দেখি, তখন শুধুমাত্র আনন্দ থাকে এবং আনন্দ থাকলে তোমার মধ্যে কোন চিন্তা রেকর্ড (নথিভুক্ত) হয় না। সেখানে কেবল শূন্য আকাশ থাকে। সেইজন্য, আনন্দিত হলে তুমি হালকা অনুভব কর, কারন কিছুই রেকর্ড হয় না। যখন তুমি সবকিছুকে বেদনার মধ্য দিয়ে দেখো, তোমার মধ্যে আরও বেশী চিন্তা রেকর্ড হয় ও তুমি ভারী অনুভব কর।
একটা উক্তি আছে, 'জিনিষগুলি যেমন, ঠিক তেমনভাবে আমরা দেখি না। আমরা যেমন, সেভাবে আমরা জিনিষগুলিকে দেখি'
তুমি ক্ষমতাহীন হলে, তোমার পরিবেশকে তুমি তোমার চেয়ে ক্ষমতাবান বানাও। যখন তুমি ক্ষমতাপূর্ণ হও, তুমি তোমার পরিবেশকে তোমার সামনে ক্ষমতাহীন করে ফেল। যদি অনুভব কর, যা দেখছ তাতে খারাপ কিছু আছে, তাহলে তোমাকে নিজের ভিতরে তাকিয়ে দেখা উচিত, কারন তোমার পরিবেশ তো কেবল তোমার ভিতরে যা আছে তারই প্রতিফলন। যদি তুমি অন্তরে পবিত্র প্রেম অনুভব কর, তখন বাইরেও পবিত্র প্রেম অবলোকন কর। সর্বদাই সেটা 'তোমার' সাথে সংযুক্ত, তুমি যা দেখছ তার সাথে নয়।
কষ্টভোগ হল তোমার প্রত্যক্ষকরণ
কেউ জীবনমুক্ত মাস্টার যে কৃষ্ণমূর্তিকে জিজ্ঞাসা করেছিল কিভাবে যা যেভাবে আছে তার সাথে নিজের সুর বেঁধা যায়। তিনি সুন্দরভাবে বলেছিলেন , 'সেটাকে কোন নাম দিও না, দেখবে তুমি তার সাথে সুর বেঁধে ফেলেছ!'
সাধারণত কিছু দেখলে, হয় তুমি সেটার সাথে শনাক্ত করার চেষ্টা কর বা সেটাকে বর্জন (condemn) করার চেষ্টা কর। যাকে দুঃখকষ্ট বল, তা যখন তুমি অভিজ্ঞতা কর, তুমি হয় সেটাকে স্বীকার কর অথবা কিছু না পালাবার চেষ্টা কর! তুমি কখনও বোঝ না বা দুঃখকষ্টকে ছাড়িয়ে যাও না। তুমি কেবল তোমার প্রসঙ্গের কাঠামোর পরিস্থিত সীমিত দৃষ্টিপথে আটকে যাও। বাস্তবিকভাবে বুঝতে হলে, তোমাকে এই সীমিত দৃষ্টিকোণ ছাড়িয়ে যেতে হবে। সেটা করার জন্য, তোমাকে সেই ব্যাপারটাকে দুঃখকষ্ট নাম দেওয়া বন্ধ করতে হবে, ব্যস! তাহলে আর কোন দুঃখকষ্ট থাকবে না। কেবল সেটাকে নাম দিয়ে তুমি সংঘাত শুরু কর। এইভাবে যা যেভাবে আছে, তুমি তাকে সেভাবে দেখা - তাকে কোন নাম না দিয়ে।
একটা ছোট গল্প :
এক ব্যক্তি বাসে চড়ে একজনের পাশে বসল। ব্যক্তিটি দেখল পাশের লোকটি একটা হিপি। সে কেবল একটা জুতাই পরেছিল।
ব্যক্তিটি জিজ্ঞাসা করে, 'আপনি কি একটা জুতাই হারিয়ে ফেলেছেন?'
যুবকটি উত্তর দেয়, 'না, আমি একটা জুতা পেয়েছিল।'
কোন পরিস্থিতি, কোন মানুষ বা বস্তকে নাম দেওয়া বন্ধ কর ! শুধু দেখো, ব্যস। দোষ দেওয়া বা স্বীকার করার চিন্তাগুলিকে কোন জায়গা দিও না।
প্রাথমিকভাবে যা কিছু দেখা তাতে রায় দেবার বাধ্যবাধকতা থাকে কারন সেটা তোমার স্বভাব। কিন্তু যা যেভাবে আছে সেভাবে দেখে যখন তোমার মধ্যে বিরাট শক্তি বিমুক্ত হওয়া অভিজ্ঞতা কর, তখন তুমি সেইভাবেই থাকতে চাও - চিন্তা, উদ্বিগ্নতা ও দুঃখকষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে।
Page 7
প্রক্রিয়া
বারংবার 'যা যেভাবে আছে'-তে ফিরে আসা
যা যেভাবে বাস্তবিক আছে, তা থেকে পালাবার চেষ্টা করাকে তুমি কিভাবে বন্ধ করতে পার? কিভাবে প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বদা উপভোগ করতে পার ?
এই ছোট প্রক্রিয়াটি চেষ্টা কর :
যখন কিছু দ্যাখো, যেমন কোন ব্যক্তি বা পরিস্থিতি বা বই বা যা কোনকিছু, সাধারণত পুরানো চিন্তা ও পরিচিত প্রতিক্রিয়াগুলি তোমার মধ্যে তৎক্ষণাৎ উদিত হয়।
সজাগতা নিয়ে এসো যে এই প্রভাবিত চিন্তা ও স্মৃতিসকল তোমার বিচারকে আচ্ছাদিত করছে এবং সেই চিন্তাগুলিকে চূড়ান্ত বলে প্রত্যক্ষ কর। তারপরে সেই পরিস্থিতি, ব্যক্তি বা বস্তুটিকে এখন এক তরতাজা চোখ দিয়ে দ্যাখো, যেন সেটাকে প্রথমবার দেখছ হঠাৎ দেখবে, তোমার নিজের ধারণা ও চিন্তার জন্য তুমি কতই না মিস্ করেছ।
এমনকি নিজের পা, পাতা, গাছ বা কাউকে যখন দ্যাখো, তাদের এমনভাবে দ্যাখো যেন তাদের প্রথমবার দেখছ হঠাৎ তুমি উপলব্ধি করবে যে পুরানো দুঃখকষ্ট আর ফিরে আসছে না এবং তুমি সবাইকে এক দেখতে শুরু করেছ, সে তারা পরিচিত হোক কি অপরিচিত হোক। সেটাই সঠিক উপায়।
কেউ পরিচিত নয় অথবা অপরিবর্তনীয় নয়। এমনকি নিজের পত্নীকেও তোমার জানা নেই! প্রত্যেকে অনস্তিত্বের সাথে প্রতিটি মুহূর্তে অবিরত পরিবর্তিত হচ্ছে। কেবলমাত্র তোমার মন তাদের চিরস্থায়ী মনে করাবার চেষ্টা করছে।
একবার তুমি যা যেভাবে আছে সেভাবে দ্যাখা আরম্ভ করলে, তোমার সম্পূর্ণ শক্তি তোমার মধ্যে সুসংহত হবে। কোন দুশ্চিন্তা, কোন সংঘাত থাকবে না। যা দ্যাখো তাতে তোমার চিন্তাগুলি বাঁধা দিলে সংঘাত ঘটে। একবার সংঘাত মিলিয়ে গেলে যে শক্তিকে দুঃখকষ্ট বিনিয়োগ করা হয়েছিল তা উন্মোচিত হয় এবং তুমি মুক্ত হও।
Page 8
তুমিই সম্পূর্ণরূপে দায়ী
অন্যান্য ব্যক্তি ও বাইরের ঘটনাগুলিতে আবেগভরে বেশী করে বিনিয়োগ করলে দুঃখকষ্ট ঘটে।
আর যাই হোক, সেগুলির ওপরে তোমার কত নিয়ন্ত্রণ আছে? তুমি অনুপ্রেরণার নিজের উৎস হও। তোমার প্রসন্নতাকে অপরের কাছে বন্ধক রেখো না!
স্মরণ রেখো, নিজের কষ্ট ও নিজের প্রসন্নতার জন্য তুমিই সম্পূর্ণরূপে দায়ী। এটাই কঠিন সত্য!
একটি গল্প :
এক শিষ্য মাস্টারকে বারবার জিজ্ঞাসা করতে থাকে, ‘মাস্টার, স্বর্গোদ্যান কোথায়?’
পথে মাস্টার একদিন তাকে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি সত্য জানতে চাও?’
শিষ্য তৎপর হয়ে বলে, ‘হ্যাঁ!’
মাস্টার বলেন, ‘ঠিক আছে, আমার প্রথম শিষ্য স্বর্গোদ্যানে আছে।’
এই কথা বলে মাস্টার চোখ বন্ধ করলেন ও ধ্যানে চলে গেলেন।
শিষ্যটি জানত যে মাস্টার চোখ খুলতে অনেক সময় নেবেন। তাই সে অন্য শিষ্যদের জিজ্ঞাসা করল যে প্রথম শিষ্যটি কোথায় থাকে। দেখা গেল, কেউ তা জানত না।
পরে একটি শিষ্য বলল, ‘তোমাকে সেখানে যাবার রাস্তা বলতে পারি, কিন্তু আমি নিজে সেখানে কখনও যাই নি। বরকফে ঢাকা পর্বতমালা ছাড়িয়ে সে এক গভীর উপত্যকাতে আছে।’
শিষ্যটি সতর্কভাবে যাবার রাস্তা লিখে রাখল এবং মাস্টারের কাছে ফিরে গেল। সে তাকে বলল, ‘মাস্টার, আমি আপনার প্রথম শিষ্যের কাছে যেতে চাই!’
মাস্টার কোন কাজে গভীরভাবে মগ্ন ছিলেন। মাথা না তুলেই তিনি বললেন, ‘এগিয়ে যাও।’
শিষ্য তার যাত্রা শুরু করল। সে অনেকদিন চলতে থাকল, রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ারপাতা আরও কতকিছুর মধ্য দিয়ে চলতে থাকল সে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ল, প্রায় মৃত্যুর মুখে। উপত্যকায় পৌঁছাতে তার একশ দিন লেগে গেল। অবশেষে উপত্যকায় পৌঁছানোর পরে সে চারিদিকে তাকিয়ে ভাবল, ‘এই উপত্যকাতেই তো অত ভাল দেখছি না। আমি এর চাইতে সুন্দর উপত্যকা দেখেছি। মাস্টার এটাকে কেন স্বর্গোদ্যান বলেন?’
আশেপাশে দেখতে দেখতে সে আরও এগিয়ে গেল ও সর্বশেষে প্রথম শিষ্যের কুঁড়েঘর দেখতে পেল। প্রথম শিষ্যটি তাকে দেখে খুব খুশী। সে তাকে খাবার দিল এবং মাস্টার ও অন্যান্য শিষ্যের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করল।
সর্বক্ষণ শিষ্যটি মনে মনে ভাবছিল, ‘মাস্টার এই জায়গাটিকে স্বর্গোদ্যান বলেন? আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’
এক সপ্তাহ সেখানে থেকে সে বিদায় নিল এবং মাস্টারের কাছে ফিরে এল। ফিরতে ফিরতে তার আরও এক দিন লেগে গেল।
সে সোজা মাস্টারের কাছে গিয়ে বলল, ‘আপনি বললেন সেই জায়গাটি স্বর্গোদ্যান। কিন্তু আমি তো সেটাকে একটা অতি সাধারণ জায়গা দেখলাম!’
মাস্টার বললেন, ‘হে ঈশ্বর! তোমার জিজ্ঞাসাবাদের সময় যদি আরও স্পষ্ট
Page 9
করে তোমার অভিপ্রায় ব্যক্ত করতে আমি তোমাকে সত্যটি বলতাম!'
শিষ্য প্রশ্ন করে, 'সত্য কি?'
মাস্টার উত্তর দিলেন, 'সে স্বপ্নদোষে নেই! স্বপ্নদোষ তার ভিতরে আছে!'
যখন তুমি যা যেভাবে আছে সেভাবে দ্যাখো, তুমি স্বর্গে আছ। যখন তুমি যা দেখতে চাও, তাই দেখতে চাও, তুমি নরকে আছ। যদি তুমি বোঝো যে সবকিছুই মঙ্গল, তাহলে তুমি প্রত্যাশা ছেড়ে দেবে এবং জিনিষগুলি যেভাবে আছে সেভাবেই দেখবে, কারণ সবকিছুই মঙ্গলকর।
যখন কোন প্রত্যাশা বিনা তুমি অস্তিত্বের কাছে বাস কর এবং যা যেভাবে আছে সেভাবেই দ্যাখো এবং তার মধ্যে আশীর্বাদ দেখতে পার, তুমি তোমার মধ্যে স্বর্গকে বহন করবে! স্বর্গ ভৌগলিক নয়, তা হল মানসাত্মিক। সেটা স্থুল নয়, সেটা মানসিক। যদি তুমি নির্ণয় নাও, তুমি এক্ষুণি স্বর্গে থাকতে পার।
দুঃখকষ্টকে ভর করে তোমার আমিত্ব বর্ধিত হয়
দুঃখকষ্ট ছাড়া তোমার আমিত্ব থাকতে পারে না। দুঃখকষ্ট হল তোমার আমিত্বের মূলে। এই গুরুগম্ভীর জিনিষটাকে তোমার বোঝা প্রয়োজন।
আমরা সর্বদা ভাবি যে আমিত্ব দুঃখকষ্ট দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়।
না! আমিত্ব দুঃখকষ্ট দ্বারা সমৃদ্ধ হয়।
যদি তোমার দুঃখকষ্ট কম হয়, তোমার আমিত্ব নিজেকে খুব ছোট মনে করে! তুমি জ্বলছ তুমি খুবই ছোট, তাই তুমি তোমার দুঃখকষ্ট বাড়াও, যাতে তুমি অনুভব করতে পার যে তুমি কেউ একজন।
অনেক সময় তুমি হয়ত দেখেছ যখন কেউ তোমাকে কিছু বলে, তোমার মধ্যে প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় এক বাধা, একটা 'না'।
যখন তুমি 'না' বল, সেটা আমিত্বকে তুষ্টি প্রদান করে। তুমি নিজের ভিতরে শক্ত ও দৃঢ় অনুভব কর। যখন তুমি 'হ্যাঁ' বল, তুমি জলবৎ, বেদ্য ও অসুরক্ষিত অনুভব কর। তোমার আমিত্ব বশবর্তী অনুভব করে ও সেটা অস্বস্তিকর হয়; তাই তুমি বল 'না'।
নিয়মকানুনকে 'না' বলে তোমার আমিত্বের শক্তিবৃদ্ধি হয়। সেইজন্য বাড়ীতে, স্কুলে, কর্মক্ষেত্রে বা গাড়ী চালাবার সময় আইন ভাঙতে তোমার ভাল লাগে। আইনকানুনকে 'না' বলে তুমি অনুভব কর যে তোমার আমিত্বের শক্তিবৃদ্ধি ঘটছে। এটা যৌনতৃপ্তির ন্যায় দেখতে পাওয়া যায় যখন তুমি বল যে কিছু জিনিষ তাদের জন্য নয়, তারা কেবলমাত্র সেগুলিই চাইতে থাকবে!
Page 10
তুমি তোমার জীবনকে দুঃখকষ্ট দিয়ে মাপ
একই কারণে যদি তোমার দুঃখকষ্ট বিরাট হয়, তোমার ভাল লাগে, তোমার আমিত্ব তুঙ্গে থাকে। তোমার দুঃখকষ্টের পরিমাণ দ্বারা তুমি নিজের জীবনকে মাপ। অজ্ঞাতে তুমি অন্যের ও নিজেকে নিপীড়ন কর।
যত বেশী কষ্ট পাও, তোমার আমিত্ব ততই বলবান হয়। তাই তুমি সর্বদাই তোমার কষ্টকে বাড়িয়ে বল। তুমি চারদিকে যাও এবং বল, ‘ও, আমার জীবন তোমরা জান না। আমর দুঃখকষ্ট তোমরা জান না।’
সমস্যা হল, কিছু সময় পরে ভুলে যাও যে তুমি বাড়িয়ে চড়িয়ে বলেছিলে। ভুলে যাও যে তোমার কষ্টকে তুমিই অতিরঞ্জিত করেছিলে। আর এখন সেই জালে তুমি জড়িয়ে পড়েছ।
কিন্তু স্পষ্ট হও, তোমার সৃষ্টি করা জানেই তুমি ধরা পড়েছ।
যখন তুমি তোমার আমিত্বের জন্য জীবনযাপন করার চেষ্টা কর, তুমি নিজের ও অন্যের জীবন দুর্দশাগ্রস্ত কর। বেশীরভাগ সময় তুমি যে দুর্দশা ভোগ কর তা অন্যরা সৃষ্টি করে নি। তুমি সেগুলি অজ্ঞাতসারে সৃষ্টি করেছ। তুমি হয়ত সেগুলি থেকে কোন উপকার পাবে না কিন্তু কেবল তোমার আমিত্বকে প্রমাণ করার জন্য তুমি সেগুলি সৃষ্টি কর।
Page 11
তুমি ভাব দুঃখকষ্ট তোমাকে অসাধারণ বানায়
সাধারণ জীবনে গড়পড়তা প্রতিটি মানুষ নিজেকে অসাধারণ ভাবে। সর্বাধিক কষ্ট পেয়েছে, এরকম ভেবে তোমার আমিত্ব স্বস্তি পায় যে তুমি এত কঠিন জীবন পরিচালনা করতে সমর্থ হয়েছ। কেবল তোমার শক্তি বিরাট হলে নিজেকে বড় বলে অনুভব কর। শক্তি ছোট হলে নিজেকে ছোট অনুভব কর। তাই যত বড় তোমার আমিত্ব, তোমার দুঃখকষ্ট তত বেশি!
কেবল যখন তোমার আমিত্ব থাকে না, তুমি নিজেকে ও জীবনকে সত্যসত্যই উপভোগ করতে পার। আমিত্ব থাকলে তুমি উপভোগ করতে পার না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি মেক-আপ লাগাতে পার যাতে অন্যরা তোমাকে উপভোগ করতে পারে, কিন্তু তুমি নিজেকে উপভোগ করতে পার না। যে ব্যক্তির আমিত্ব নেই, যে নিজেকে দেহ ও মনের সাথে শনাক্ত করে না, শুধুমাত্র সে নিজেকে উপভোগ করতে পারে।
যদি তুমি কোন জিনিষকে নিজের বলে ভাব, তুমি উপভোগ করতে পার না। কারণ কোনকিছুরকে নিজের বলে ভাবলে, তুমি তো সেই জিনিষ বা সম্বন্ধতা উপভোগ করার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলবে।
একটা ছোট গল্প :
জাপানে এক জীবনমুক্ত মাস্টার ছিলেন। তাঁর নাম সুজুকি। তাঁর মাস্টারের দেহত্যাগ করলে তিনি ভীষণভাবে কাঁদতে থাকলেন।
একজন তাঁকে প্রশ্ন করল, 'আপনি জীবনমুক্ত। আপনার মাস্টারের দেহত্যাগে আপনি এত কাঁদছেন কেন?'
সুজুকি উত্তর দিলেন, 'পূর্বজন্মে আমার মাস্টার এক অসাধারণ মানুষ ছিলেন' লোকটি দ্বাবড়ে গেল ও জিজ্ঞাসা করল, 'তাঁর সম্পর্কে এত অসাধারণ কি ছিল?'
Page 12
সুজুকি জবাব দিলেন, ‘আমি কখনও এরকম অসাধারণ মানুষ দেখি নি যে নিজেকে সবচেয়ে বেশী সাধারণ ভাবত!’
সুজুকির মাস্টার অসাধারণ ছিলেন কারণ তিনি নিজেকে অত্যন্ত সাধারণ ভাবতেন। এদিকে বিশ্বে প্রায় প্রতিটি মানুষ নিজেকে অসাধারণ ভাবে।
যদি তুমি নিজেকে অসাধারণ ভাব, স্পষ্ট হও যে তুমি সাধারণ।
যদি নিজে সাধারণ কিনা জানতে চাও তাহলে সেই পরীক্ষাটি কর। যদি অসাধারণ অনুভব কর, স্পষ্ট হও : তুমি গড়পড়তা। যদি গড়পড়তা অনুভব কর, তুমি অসাধারণ!
আরেকটা ছোট গল্প:
ভারতবর্ষে এক অহংকারী রাজা ছিল। তার আমিত্ব এত বেশী হয়ে গিয়েছিল যে সে ঘোষণা করা শুরু করল, ‘ভগবান যা করে আমি তা করতে পারি। আমি ভগবানের মতোই মহান!’ যদি কেউ রাজার অভিমতে আপত্তি করত, রাজা অবিলম্বে তাকে শূলে চড়াবার আদেশ দিত।
সেই রাজ্যে একজন জীবনমুক্ত মাস্টার ছিলেন। রাজধানীতে এসে তিনি রাজার মনোভাব সম্পর্কে শুনলেন এবং রাজাকে সত্য দেখাতে চাইলেন।
তাই তিনি রাজদরবারে গেলেন এবং রাজার উপস্থিত লৌহিক শৃঙ্খল ভেঙ্গে বললেন, ‘হে রাজন, আপনি তো ঈশ্বরের সমান। আপনিই তো ঈশ্বর।’
রাজা খুব খুশী। সে বলে, ‘হাঁ, আপনাকে তো খুবই বুদ্ধিমান ব্যক্তি মনে হচ্ছে। আমাদের বলুন আপনি আরও কি কি উপলব্ধি করেছেন।’
মাস্টার বললেন, ‘হে রাজন, আপনাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ বলতে হবে। আপনি তো এমন কিছু করতে পারেন যা ঈশ্বরও করতে পারেন না !’
এখন রাজা তো গর্বে ভরে যাচ্ছিল। সে বলে, ‘কি করে বলুন আমি এমন কি করতে পারি যা স্বয়ং ঈশ্বরও করতে পারে না?’
মাস্টার শান্তভাবে বললেন, ‘হে রাজন, আপনি কারও সাথে ক্রোধিত হলে তাকে আপনার রাজ্য থেকে বার করে দিতে পারেন, কিন্তু ঈশ্বর তা পারেন না।’
ঈশ্বর কখনও আমাদের তাঁর রাজত্ব থেকে বার করে দিতে পারেন না, কারণ ঈশ্বরের রাজত্ব, সেটাকে বলে জীবনমুক্তি, তাতে তো আমাদের জন্মাধিকার আছে!
Page 13
দুঃখকষ্ট এক নেশা হয়ে যেতে পারে
তোমার জীবনে পাওয়া প্রায় সমস্ত দুঃখবেদনাগুলিকে নিজের কায়েমী স্বার্থের তুপ্তির জন্য জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে তুমিই সৃষ্ট কর। দুঃখকষ্টের একটা বিরাট গোপন কারণ হল তুমি সেটা উপভোগ কর। উদাহরণস্বরূপ, অসুস্থ হওয়া সুখের উৎস হতে পারে যদি তখন তোমার আকাঙ্ক্ষিত মনোযোগ ও যত্ন পাও।
কিছু মানুষ দুঃখকষ্ট এত ভালোবাসে যে সেটা তাদের ‘দ্বিতীয় প্রকৃতি’ হয়ে যায়। সেটা যেন এক আরামদায়ক অনুভূতি। দেখো, তুমি কিছু কিছু ভজিতে বসো কারণ তাতে তুমি আরাম পাও, সুখকর অনুভূতি পাও। একইভাবে বিষণ্ণতাও তোমাকে এইপ্রকার মানসিক সুখকর অনুভূতি প্রদান করে এবং সেটা ছাড়া তুমি নিজেকে অনমনীয় বা কিছু একটা হারাচ্ছ ভাব। এইভাবে বিষণ্ণতা তোমার তন্ত্রে (সিস্টেমে) শিকড়িত হয়। কষ্ট পাওয়া যেন এক নেশা হয়ে যায়। লোকেরা ওটা নিয়ে খুবই খুশী। সেটা ছাড়া তারা কিছু একটা মিস্ করা অনুভব করে।
সেটাকে আমি বলি পরিপক্ক বেদনার শরীর।
দ্যাখো, যখন তোমার শূন শরীরের পরিপক্ক হয়, সেটা তার নিজের দেহের নয় অন্য অনেক দেহের জন্ম দিতে থাকে; একইভাবে যদি সেই বেদনা-শরীর পরিপক্ক হয়ে যায়, সেটা প্রসারিত হতে থাকে এবং নিজেকে জন্ম দিতে থাকে। অনেক, আরও অনেক বেদনা-শরীরের সৃষ্টি হয়। বেদনা-শরীর পরিপক্ক হয়ে গেলে সেটা নিজের মত আরও বেদনা-শরীরের জন্ম দিতেই থাকে।
বেদনা-শরীরকে ধরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটা যাতে পরিপক্ক না হয় ও তাতে আসক্তি না হয়ে যায়, সেজন্য যত্ন নেওয়া উচিত।
প্রয়োজনীয় দুঃখকষ্ট
কখনো কখনো লোকেরা আমায় জিজ্ঞাসা করে, 'স্বামীজী, দুঃখকষ্ট কি প্রয়োজনীয়?' হ্যাঁ এবং না!
বৃক্ষ হবার জন্য বীজের বিদারণ হতে হবে, একইভাবে ভীষণ দুঃখকষ্ট তোমার আমিত্বের বিদারণ করতে পারে এবং তোমাকে রূপান্তরের জন্য উন্মুক্ত ও তৈরি করতে পারে। তোমাকে সুসংহত ও রূপান্তরিত করার জন্য দুঃখকষ্টের বিরাট ক্ষমতা আছে।
মহাভারতে পাণ্ডবদের মাতা কুন্তীর একটি সুন্দর কথা আছে। তিনি কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেন, 'হে কৃষ্ণ! আমার জীবনে সব দিন থেকে বেদনা ও কষ্ট আসতে দাও। সেগুলি আমাকে অবিরত তোমাকে স্মরণ করাবে, হে প্রভু'
তোমার অভিজ্ঞতাগুলিকে কোন বিচার না করে প্রত্যক্ষ করা শুরু কর। স্পষ্টতা সহকারে দেখো গভীর ও সুক্ষ্ম তরলগুলিতে তুমি কোথায় কষ্ট পাচ্ছ। তুমি সজাগ হলে দুঃখকষ্ট নিজেই তোমার চোখ খুলে দেখিয়ে দেবে দুঃখকষ্টের আবাসস্থলকে। সেটা তোমাকে শিক্ষা দিতে পারে, কষ্ট পাওয়া কত অহেতুক, অপ্রয়োজনীয়। সেটাকেই আমি বলি ‘প্রয়োজনীয় কষ্ট’। একবার প্রয়োজনীয় দুঃখকষ্ট দ্বারা তুমি শিক্ষা পেলে, তুমি আরও পরিপক্ক ও সুন্দরভাবে দুঃখকষ্টকে পরিচালিত করতে পারবে।
বেদনাকে অথবা যে তোমাকে বেদনা দিচ্ছে, তাদের কখনও অভিসম্পাত কোরো না। তার পরিবর্তে, সেটাকে এক আশীর্বাদ হিসাবে সুযোগ নাও, নিরপেক্ষভাবে প্রত্যক্ষ করার এবং বেদনার মূল কেটে ফেলা। বেদনা এক মহান শিক্ষক হতে পারে, যদি তাকে হতে দাও। যদি তুমি সঠিকভাবে বেদনার কার্য-কারণ সম্পর্কে গবেষণা কর, সেটা তোমার জীবনে সবচেয়ে বড় সন্দীক্ষণ হয়ে যেতে পারে।
Page 14
দুঃখকষ্টের অভ্যন্তরে অন্তর্দৃষ্টি
জীবনমুক্ত মাস্টার বোধিধর্ম বলেন, ‘প্রতিটি দুঃখকষ্টই একটি বুদ্ধবীজ।’ তিনি বলেন দুঃখকষ্ট ও বেদনার জন্য কৃতজ্ঞতা অনুভব কর কারণ সেগুলি তোমার জন্য এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যার জন্য তুমি সত্য অনুসন্ধান করায় প্রেরিত হও। কষ্ট তোমাকে এক বুদ্ধ হওয়ার দিকে চালিত করতে পারে।
Page 15
বেদনা একটি অসত্য
জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে, তোমার এক পছন্দ (চয়েস) আছে। হয তুমি জীবনকে বেছে নিতে পার অথবা দুঃখকষ্টকে বেছে নিতে পার। হয তুমি জীবনকে কুড়িয়ে নিয়ে জীবনযাপন করা বেছে নিতে পার ; অথবা তুমি দুঃখকষ্ট নামক অসত্যকে কুড়িয়ে নিতে পার। যদিবা তুমি বেদনা ও কষ্ট কুড়িয়ে নাও, সেগুলি তো অবাস্তব জিনিষ কুড়িয়ে নেওয়া হল। আমি তোমাদের সত্য বলছি, আমি আগ্রহী যে তোমরা অসত্যকে কুড়িয়ে নেবে না। বেদনা একটা অসত্য। যখন তুমি বেদনা কুড়িয়ে নাও, তুমি সত্য এক অসত্য কুড়িয়েছ। সেজন্য আমি বলছি, বেদনাকে কুড়িয়ে নিও না।
আরেকটা জিনিষ : যখন তুমি বেদনা কুড়িয়ে নাও, তুমি অন্যদের বেদনাই দিয়ে থাকবে। যখন তুমি বল যে তোমার মাথা ধরেছে, তার অর্থ এই যে তুমি অন্যদের মাথাব্যথা হতে যাচ্ছ! সেটাই এর অর্থ।
তাই খুঁজে বার কর, তোমার মন বাস্তবিক কি বোঝাচ্ছে। বোঝ! সেটা তো তোমাকে কেবল দুঃখকষ্টে রাখছে। আমি তোমাদের বলি, জীবনের জন্য যেকোন কিছু সমর্পণ করা যায়। এক আনন্দময় জীবনের জন্য তোমার যেকোন কিছু সমর্পণ করা উচিত। এটাই লৌকিক বিধান।
কৃষ্ণ সুন্দর বলেন - যা কিছু তুমি আমার জন্য সমর্পণ কর, তুমি আমাকে পাবে এবং যা সমর্পণ করেছ তাও পেয়ে যাবে। আর কোন কিছুর জন্য যদি তুমি আমাকে সমর্পণ করে ফেল, তুমি আমাকে তো পাবেই না, আর সেই জিনিষটিও পাবে না।
আমিও একই কথা বলছি। কোন কিছুর জন্য যে আমাকে সমর্পণ করেছে, সে আমাকে পাবে না, আর সেই জিনিষটিকেও পাবে না। যে আমাকে পাবার জন্য কোন জিনিষ সমর্পণ করে, সে আমাকে তো পাবেই, আর সেই জিনিষটিকেও পেয়ে যাবে। ব্যস। এটাই সত্য। এটাই পরম সত্য!
জীবনের জন্য তুমি যা কিছু কর, দেখবে জীবন কত সুন্দরভাবে আছে। জীবনের ব্যাপারে এক শক্তিশালী, স্পষ্ট বোধ ঘটবে। তাই যখন তোমার মন বলে যে মন তোমাকে সুরক্ষিত রাখছে, তার মানে মন তোমাকে দুঃখকষ্টে রাখছে। এটাই তার অর্থ।
তোমার অস্তিত্বই দুঃখকষ্ট
তোমার দুঃখকষ্টের গভীরতার সত্যটি বোঝ : তোমার অস্তিত্বের কাছে তোমার অস্তিত্ব প্রকাশ করার জন্য তোমার অস্তিত্বই এক দুঃখকষ্ট। তোমার ভিতরের দমিত 'তুমি' সেই দমন থেকে মুক্ত হতে এবং নিজেকে তোমার কাছে প্রকাশ করতে চাইছে। দুঃখকষ্ট কোন কারণের জন্য নয়। দুঃখকষ্টের কিছু কারণ খোঁজার জন্য সমস্ত প্রচেষ্টা হল তোমার নিজে থেকে বাস্তব জীবনকে হারিয়ে ফেলতে চাওয়া।
যদি তুমি তোমার কষ্টের কারণ খোঁজার করার চেষ্টা কর, তুমি সেই কারণটির ওপরে প্রতিশোধ নেবে। যদি তুমি ভুল করে তোমার পতিকে তোমার পীড়ন জন্ম শনাক্ত কর, তুমি তার ওপরে প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করবে। কেবল তার ওপরে প্রতিশোধ নেবার জন্য তুমি বারবার জন্ম নেবে। যদি তুমি দেখ যে তোমার কষ্টের কারণ তোমার বস, তুমি তার ওপরে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবে। যদি তুমি তোমার স্বপ্নতুলিকে তোমার দুঃখকষ্টের কারণ বলে ভাব, তুমি তাদের ওপরে প্রতিশোধ নিতে সচেষ্ট হবে। যদি তুমি মানবসমাজকে তোমার দুঃখকষ্টের কারণ হিশাবে দ্যাখো, তুমি বারবার জন্ম নেবে এবং সমাজের ওপরে প্রতিশোধ নেবার জন্য আতুরবাদী হয়ে যাবে।
বারংবার ভুল কারণের ওপরে প্রতিশোধ নেওয়াকে আমি বলি পুনরায় মরনণ, পুনরাপি জন্মন। জন্ম ও মৃত্যু, আর জন্ম ও মৃত্যু, আর জন্ম ও মৃত্যু।
সেইজন্য আমি বলি : তোমার দুঃখকষ্টের জন্য কোন কারণ শনাক্ত করার চেষ্টা করে যদি কোন কারণ না পাও, তুমি আশীর্বাদপুষ্ট। তখন তুমি উপলব্ধি করবে যে দুঃখকষ্টের কোন কারণ নেই। তার কোনই কারণ নেই।
Page 16
দুঃখকষ্টের পশ্চাতে বিজ্ঞান
যখন আমি বলি, ‘বেদনা এক অসত্’ এবং যখন আমি বলি, ‘তোমার অস্তিত্ব ব্যাপারটাই কষ্টের’, দুটোই সত্য। যখন আমি বলি ‘তুমি দুঃখকষ্ট ছাড়া আর কিছু নও’ এবং যখন বলি, ‘তুমি দুঃখকষ্টকে ছাড়িয়ে’, দুটোই সত্য। তুমি তোমাকে যেভাবে বোঝ, যদি সেভাবে নিজেকে শনাক্ত কর, তাহলে তুমি দুঃখকষ্ট ছাড়া আর কিছু নও কিন্তু আমি তোমাকে যেভাবে বুঝি যদি তুমি তোমাকে সেভাবে শনাক্ত কর, তুমি তাহলে দুঃখকষ্টকে ছাড়িয়ে আছ। কিন্তু এই দুটোর মধ্যে আছে সমস্যা।
আজ আমি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করছি। প্রকৃতির যে কোন জিনিষের চেয়ে চেতনা লঘুতর। চেতনা আকাশ (স্পেস) থেকেও লঘুতর। তাই চেতনা সর্বদাই উর্ধ্বমুখে টানে। চেতনা তোমাকে উর্ধ্বমুখে টানে। বস্তু, পৃথিবী অনবরত তোমাকে নিম্ন দিকে টানে। উর্ধ্বমুখী চেতনা আর নিম্নমুখী বস্তুর মধ্যে একটা টানাপোড়েন চলছে।
মাধ্যাকর্ষণ উভয়ই তোমার শরীর ও স্নায়ুতন্ত্রে অবিশ্রাম ঘটছে। উখান ও মাধ্যাকর্ষণের মধ্যে ঘর্ষণ হল চিন্তাসমূহ। চিন্তাসমূহ আর কিছুই না, সেগুলি তো কেবল তোমার স্নায়ুতন্ত্রে অবিশ্রাম ঘটনা উখান ও মাধ্যাকর্ষণের মধ্যে সংঘর্ষ।
তোমার সিস্টেমে (তন্ত্রে) উখান ও মাধ্যাকর্ষণ উভয় ঘটার জন্য দুঃখকষ্ট ঘটে। তার অর্থ, চিৎ ও জড় অর্থাৎ চেতনা ও বস্তু উভয় তোমাকে টানাটানি করছে। তোমার স্নায়ুতন্ত্রে এদিক ওদিক থেকে টানাটানি করছে।
যদি সেই সংঘর্ষ মেরুদন্ডের মূলে মুলাধার চক্রে অনুভূত হয়, তখন মাধ্যাকর্ষণ খুব বেশী এবং তোমার চিন্তাগুলি স্থুল। যদি আরেকটু উপরে অর্থাৎ নাভির নীচে স্বাধিষ্ঠান চক্রে সংঘর্ষ অনুভূত হয়, তার অর্থ চিন্তা একটু কম, কিন্তু তা সত্ত্বেও সেগুলি স্থুল হয়ে আছে। যদি নাভি কেন্দ্রে মণিপুরচক্রে সেই সংঘর্ষ উপলব্ধ হয়, তুমি আরও একটু বিশুদ্ধ, তার অর্থ আরও একটু কম চিন্তাসমূহ। যদি হৃদয় অঞ্চলে অনাহত চক্রে সংঘর্ষ অনুভূত হয়, তোমার চিন্তা আরও কম হয়। তাই বেশীরভাগ সময়ে তোমার তন্ত্রে কোথায় সংঘর্ষ অনুভূত হয়, তার ওপর নির্ভর করে তোমার মানসিক গঠন নির্ধারিত হয়।
দুঃখকষ্ট হল আকাশ ও সময়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব
আকাশ সর্বদা তোমাকে উর্ধ্বে টানে, আর সময় তোমাকে নিম্নে টানে। আকাশ বলতে বোঝাচ্ছি, তোমার অন্তর-আকাশ, তোমার মানসাত্মিক আকাশ, সেটা তো শুদ্ধ চেতনা। সময় বলতে বোঝাচ্ছি, তোমার অন্তর-সময়, তোমার মনস্তাত্ত্বিক সময় - সেটাকে মাপা হয় তোমার ভিতরে চলা চিন্তাসমূহের স্পন্দনহার (ফ্রিকোয়েন্সি) দ্বারা।
Page 17
যখন তুমি চিন্তামুক্ত শুদ্ধ চেতনাতে আছ, তুমি আকাশকে সময়ের চেয়ে বেশী করে অভিজ্ঞতা করছ। যখন প্রতি সেকেন্ডে চিন্তাসংখ্যা (টিপিএস, থট পার সেকেও) বেশী হয়, তার অর্থ তুমি সময়কে আকাশের চেয়ে প্রবলভাবে অভিজ্ঞতা করছ।
যখন তোমার ভিতরে বহন করা আকাশ সময় দ্বারা আচ্ছাদিত হয়, সেটা হল মাধ্যাকর্ষণ। যখন আকাশ তোমার ভিতরে বহন করা সময়কে আচ্ছাদিত করে, সেটা হয়ে যায় উখান। যদি সময় আকাশকে ছাড়িয়ে যায়, সেটা মাধ্যাকর্ষণ। যদি আকাশ সময়কে ছাড়িয়ে যায়, সেটা উখান।
কিন্তু মাঝেমাঝে তুমি কম চিন্তা থাকলে ভারী অনুভব কর, ‘ও, কি হল? সকাল থেকে আমি এত নীরব। কিছুই ঘটছে না।’
আরে বাবা, তুমি তো শান্তিতে প্রবেশ করছ।
‘না না না! হয়ত আমি বিষণ্ণ। জানি না আমি কেন বিষণ্ণ…ও, এখন আমি বুঝেছি। ঐ গাছটার ডালটা পাতা শুকিয়ে গেছে এবং সেগুলি প্রায় ঝরে পড়ল বলে!’
তুমি কোন না কোন কারণ বার করে ফেলবে এবং সফলভাবে তোমার কম চিন্তার আকাশকে বিষণ্ণতায় রূপান্তরিত করবে!
তুমি কি উখানের জন্য প্রস্তুত?
উখানের আকাশকে পরিচালিত করা সহজ নয়, কারণ তোমার মন বেশী চিন্তার আকাশে থাকতে অভ্যস্ত। সেইজন্য মহাকাশচারীরা মহাকাশে হঠাৎ করে কম মাধ্যাকর্ষণ অভিজ্ঞতা করলে অনেক সময় বিষণ্ণ হয়ে যেতে শুরু করে।
যদি পৃথিবীতে দেখো, উচ্চতার জন্য তিব্বতে মাধ্যাকর্ষণ একটু কম। তাই মহাকাশচারীরা ও তিব্বতের নিবাসীরা উভয়ই কম মাধ্যাকর্ষণের স্থানে আছে। কিন্তু তিব্বতীরা কম চিন্তার আকাশে বাস করার ব্যাপারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাই তারা সহজেই জীবনমুক্ত হয়ে যায়। তারা কম চিন্তার আকাশকে উদযাপন করে।
যখনই তুমি তোমার ভিতরে কম চিন্তার আকাশের মূর্তিগুলিকে অভিজ্ঞতা কর, তা সযত্নে লালন কর, স্মরণে রাখ এবং উপভোগ কর। সেটাকে নিয়ে আনন্দ কর এবং তা তোমার মধ্যে বারংবার ঘটবে।
তোমার টিপিএস তোমার প্রকৃতিকে ব্যক্ত করে
কেবল দুটি জিনিষ প্রতি সেকেন্ডে চিন্তার সংখ্যাকে (টিপিএস, TPS, Thoughts per second) প্রভাবিত করে। সেটা বাড়তে পারে বা কমতে পারে। যদি উখান কম হয় এবং মাধ্যাকর্ষণ বৃদ্ধি পায়, সেটা হয়ে যায় আরও বেশী চিন্তাসমূহ। সেটাকে আমরা বলি বিষণ্ণতা। মৃত পাথর, আর কিছু নয়। কেবল একটা পাথরের মত। কিন্তু আরেকটা উপায় আছে। যখন মাধ্যাকর্ষণ কমে যায় এবং উখান বৃদ্ধি পায়, তখন প্রতি সেকেন্ডে চিন্তাসংখ্যা বলে যায়। সেটাকে আমরা বলি সত্ত্ব, পরম জ্ঞানের আলোকপ্রাপ্তি।
বুঝে নাও, বেশী মাধ্যাকর্ষণ ও কম উখান হল তমসূ (জড়তা)। তোমার স্নায়ুতন্ত্রে উখান ও মাধ্যাকর্ষণের সংঘর্ষ হল রজসূ (প্রবল আবেগ ও ক্রিয়াকলাপ)। বেশী উখান ও কম মাধ্যাকর্ষণ হল সত্ত্ব (পবিত্রতা ও ভালোত্ব)।
Page 18
ভুল শনাক্তকরণ থেকে দুঃখকষ্ট আসে
এটা বোঝ, এটা একটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম সত্য এবং সেটা আমি এখানে ব্যক্ত করছি।
তুমি বিশুদ্ধ চেতন্য বা চিৎ। তুমিই সবকিছু দেখছ।
তোমার দেখা সবকিছুই জড় (বস্তু)।
দুঃখকষ্ট ঘটে যখন চিৎ (চেতন্য) ও জড় (বস্তু) পরস্পরের সাথে লড়াই করে।
দ্রষ্টাকে দৃশ্য এবং দৃশ্যকে দ্রষ্টা অর্থাৎ চিৎ-কে জড় এবং জড়কে চিৎ হিসাবে ভুল শনাক্তকরণই সমস্ত দুঃখকষ্টের জন্য দায়ী।
যখন দ্রষ্টা ও দৃশ্য পরস্পরের ওপরে চেপে বসে, দুঃখকষ্ট ঘটে।
স্পষ্ট হয়ে যাও, কে দ্রষ্টা এবং দৃশ্যটি কি। সর্বদা জীবনের নির্নয় নাও।
দুঃখকষ্টের নির্নয় নিও না। সর্বদা জীবনকে ভোট দাও।
তোমার স্নায়ুতন্ত্রে বই চিন্তা থাকুক এবং উখান ও মাধ্যাকর্ষণের মধ্যে যতই না ঘর্ষণ তুমি অনুভব কর না কেন - অবশেষে অবশ্যই তুমি তো দুঃখকষ্টকে ছাড়িয়ে! সেটাই পরম সত্য।
প্রক্রিয়া
দ্রষ্টার আকাশে বিরাজমান থাক
উখানের সঠিক আকাশ অভিজ্ঞতা করার জন্য নীচে একটি শক্তিশালী ধ্যান দেওয়া হল।
নির্দেশাবলী
সোজা করে আরাম করে বসো।
তোমার চোখ বন্ধ রাখ এবং ভিতরে কোনকিছু না দেখে বসো।
যদি ভিতরে কিছু দেখো, তা ফেলে দাও।
অবিরত এমন এক আকাশ সৃষ্টি কর যেখানে তুমি কিছুই দেখো না ও দেখানে বিরাজমান থাক।
যা কিছু চিন্তা আসে তা ফেলে দাও।
যা কিছু আবেগ আসে তা ফেলে দাও।
নাকচ কর।
নাকচ কর।
নাকচ কর।
কোনকিছু দেখা বিপজ্জনক।
তাই কিছুই না দেখে দ্রষ্টার আকাশে থাক।
Page 19
দুঃখকষ্ট
অতিক্রম করা
দুঃখকষ্ট ও রোগ
বিভিন্ন প্রকার দুঃখকষ্ট ও আবেগগুলিকে মানুষের প্রধান রোগগুলির সাথে সংযুক্ত করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি তুমি মধুমেহ (ডায়াবেটিস) রোগে ভুগছ, তার অর্থ তুমি এমন সব বাসনা ও চিন্তা সহকারে কষ্ট পাচ্ছ যেগুলি তোমাকে পরিপূর্ণ করতে যাচ্ছে না।
ভয় রক্তচাপ সম্পর্কিত সমস্যার জন্য দায়ী। অবিরাম ভয় তোমার রক্তচাপ বাড়ায়। আমি দেখেছি এমনকি আমার সিস্টেমেও (তন্ত্র) যখন শরীরের সত্ত্বের সমস্যিতে চলে যায়, শরীরের সত্তা বেঁচে থাকার সিস্টেম তখন রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। আমি দেখেছি তা কখনো কখনো তিন সেকেণ্ডে ১৫০৭ পৌঁছে যায়। আর যখন সমাধির স্তর থেকে পঞ্চভূমে নেমে আসে, তা সাধারণত ফিরে আসে।
তোমার বেঁচে থাকার সহজাত প্রবৃত্তিকে যদি অনবরত চ্যালেঞ্জ করা হয়, তোমার রক্তচাপ বেড়ে যাবে।
যদি তুমি অবিরাম এমন সব বাসনা দ্বারা কষ্ট পাও যা তোমাকে পরিশ্রান্ত করে, তোমার রক্তে শর্করা (ব্লাড সুগার) বাড়ে।
যদি তুমি অবিরাম সংকুচিত হবার অনুভূতি বা অপরাধবোধ দ্বারা কষ্ট পাও, তা তোমার বাতরোগের (আর্থারাইটিস) কারণ হতে পারে।
যদি তুমি শারীরিক, মানসিক ও আবেগের স্মৃতিসকল দ্বারা কষ্ট পাচ্ছ, সেগুলি সরাসরি তোমার সন্ধিস্থাগুলির জন্য দায়ী।
নির্দিষ্ট কিছু আবেগজনিত বেদনা তোমার তন্ত্র প্রবলভাবে বহন করলে তোমার স্নায়ুতন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে। তুমি নিজের জীবনকে ও নিজের শরীরকে সম্পূর্ণরূপিত করতে অসমর্থ হবে।
Page 20
দুঃখকষ্ট অতিক্রম করার নয়টি উপায়
১) এক বলিষ্ঠ স্নায়ুতন্ত্র নির্মাণ করে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর
সমস্ত রোগ ও বিষণ্ণতা হল কেবল এক দুর্বল স্নায়ুতন্ত্র। তুমি কল্পনা কর ও দুঃখকষ্ট সৃষ্টি কর। কল্পনা করে সৃষ্টি করার পরে তুমি বল, ‘এটা তো একদিন হবেই, তাই আমাকে এখনই ভোগতে দাও!’
দুর্বলতাবশত, সুখ বা বেদনার একটি ছোট সংকেত তোমাকে ভারসাম্যহীন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যেভাবে সুষম ভোজন বাধ্যতামূলক, সেভাবে যোগকে বাধ্যতামূলক করা উচিত কারণ যোগ মায়ুতন্ত্রকে উচ্চ কম্পাঙ্কের বেদনা ও সুখকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্য সক্ষম করে তোলে। দুঃখকষ্ট ও সুখের সংকেতগুলো পরিচালনা করতে পারে এমন এক বলিষ্ঠ স্নায়ুতন্ত্র গঠন করার জন্য কাজ কর।
প্রক্রিয়া
তোমার শিশুকে এক বলিষ্ঠ স্নায়ুতন্ত্র উপহার দাও
দয়া করে এই সত্যটি বোঝ : শিশু যদি মাতা বা পিতার কাছে ঘুমায়, স্নায়ুতন্ত্র খুব বলিষ্ঠ হয়। স্বপ্নে শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যে সব সংকেত প্রবাহিত হয়, তা শিশুর সিস্টেমকে ধাক্কা দেবে না যদি শিশু তার পিতা বা মাতাকে ঘুমানোর সময় জড়িয়ে থাকে। তখন স্বপ্ন সংকেতগুলো শিশুর স্নায়ুতন্ত্রকে ঝাঁকুনি দেয় না।
একটি দৃঢ়বন্ধ যেন এক সুনামির ঝোট এবং সেটা যেন তোমার স্নায়ুতন্ত্রকে ঝাঁকুনি দিয়ে দুর্বল না করে ফেলে। শিশুর থাকা উচিত
গুরুকুলে যেখানে দ্বন্দ্ব হয় না অথবা পিতা বা মাতার শারীরিক নৈকট্যে। মাতা বা পিতার উপস্থিতি বা শক্তিশালী আধ্যাত্মিক অভ্যাস না থাকলে একটা ছোট্ট সংকেত শিশুকে ঝাঁকুনি দিয়ে ফেলে। তারপর একটা ছোট্ট সংকেত বা ছোট্ট চিন্তা তোমাকে বিষণ্ণতা প্রদান করার জন্য যথেষ্ট। তাই এক শক্তিশালী স্নায়ুতন্ত্র বানাবার জন্য কাজ কর যা তোমাকে বেদনা ও সুখের দ্বৈততাকে অতিক্রম করে নিয়ে যাবে এবং তোমার মধ্যে সৃষ্টিশীলতা নিয়ে আসবে।
২) বিপরীত এনগ্রাম (সংস্কার) সৃষ্টি করে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর
বিজ্ঞানী ডেভি হিউটসোর বলেন নিউরোপ্লাস্টিসিটির বিজ্ঞান ফোকাস করে যে কিভাবে মস্তিষ্ক নতুন সংযুক্তিকরণ এবং নকারায়ন্বক চিন্তা ও কার্যপ্রবাহকে ভেঙ্গে ফেলে নিজেকে নতুন করে গঠন করতে পারে।
যোগপিতা পতঞ্জলি সুন্দরভাবে বলেন, যদি তুমি এক নির্দিষ্ট এনগ্রাম দ্বারা কষ্ট পাচ্ছ, তাহলে এক বিপরীত এনগ্রাম, বিপরীত আবেগ সৃষ্টি কর। এনগ্রাম হল এক নির্দিষ্ট মানসিক ছক বা প্যাটার্ন। (এটাকে সংস্কার বলা হয়)। উদাহরণস্বরূপ, যদি তুমি সহিংসতা দ্বারা কষ্ট পাও, তাহলে করুণা সৃষ্টি কর। যদি ক্রোধ দ্বারা কষ্ট পাও, শান্তি সৃষ্টি কর এবং অনুভব কর যে শান্তি তোমার সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই শান্তিকে তোমার প্রতিটি রন্ধ্র থেকে মহাজগতে বিমুক্ত কর। দেখবে, তোমার চাওয়া মত তুমি এক নতুন মানসিকতা, মস্তিষ্কে এক নতুন প্যাটার্ন সৃষ্টি করেছ।
পতঞ্জলি ঠিক এটাই বলেছেন। তিনি অবশ্য সেটা ৫০০০ বছর আগে বলেছেন, আর আজকে বিজ্ঞানীরা সেটাকে প্রমাণ করেছে।
Page 21
৩) সঠিক প্রত্যক্ষকরণ দ্বারা দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর
দ্যাখো, তোমার জীবনে 'সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ' বলে একটা ব্যাপার আছে।
আমার দ্বারা উদ্ভাবিত এই শব্দসমষ্টিকে দয়া করে বোঝ। 'সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ' অর্থ, যখন আমি 'শান্তি' শব্দটি উচ্চারণ করি, অবিলম্বে তখন তুমি এমন কোন স্থান বা পরিস্থিতিকে স্মরণ করবে যেখানে জীবনে সত্যসত্যই শান্তি পেয়েছিলে। যখন আমি 'হিংসা' শব্দ উচ্চারণ করি, তুমি তখন এমন জায়গা বা ঘটনা স্মরণ করবে যেখানে তুমি তোমার জীবনে হিংসা অভিজ্ঞতা করেছ। সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ প্রকৃতপক্ষে এক ভিন্ন তত্ত্ববিদ্যা।
কিছু প্রত্যক্ষকরণ আছে তাদের শুধুমাত্র স্মরণ করে তুমি মুক্তি পাও - 'যস্য স্মরণ মাত্রেন জন্ম সংসার বন্ধনাত্ বিমুচ্যতে'! দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি তুমি বাতাসহীন স্থানে এক প্রদীপ স্মরণ কর, তোমার মন স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্থির হয়। এটা সেই প্রকারের প্রত্যক্ষকরণ। আমি তোমাদের এক নির্দিষ্ট উদাহরণ দিতে পারি। আমাদের বটবৃক্ষের গভীরে একটি প্রদীপ রয়েছে। সেটা একটা বাতাসহীন স্থান এবং সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত। সেই প্রদীপটি কতই না সুস্থির! তার ওপর ধ্যান কর।
যখনই আমি 'গুরুকৃপা' শব্দটি উচ্চারণ করি, আমার সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ হল অরুণাচলের মন্দিরে অরুণাগিরি যোগীশ্বরের সমাধি। এই স্থানটি আমার স্মরণে আসে। যখনই আমি 'শান্তি' শব্দটি বলি, সর্বদা আমার সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ হল বেলুড় মঠে শ্রীরামকৃষ্ণের মন্দিরের বাইরে গঙ্গার তীরে হাঁটা। সন্ধ্যার সময় মন্দিরের বাইরে গঙ্গার তীরে আমি হাঁটতাম। সেই মুহূর্তগুলিকে আমার জীবনে সবচেয়ে
শান্তিপূর্ণ বলে অভিজ্ঞতা করি। কখনো কখনো দুই এক ঘন্টার বেশী সময় হাঁটতাম। আমার মনেও থাকত না আমি একটা দেহ বহন করছি। আমি সেই সুন্দর বিরাট মন্দির, প্রবহমান গঙ্গা ও সবুজ লনে অদৃশ্য হয়ে যেতাম। সেই এক দুই ঘন্টায় আমি কেবল একটি জিনিষ জানি; মন্দির বিদ্যমান, লন বিদ্যমান, গঙ্গা বিদ্যমান। ব্যাস।
যখন আমি 'শক্তি' শব্দটি উচ্চারণ করি, আমি সর্বদা অরুণাচল পাহাড়ের চূড়াকে স্মরণ করি। সেটা শক্তির অভিব্যক্তি - বিগ ব্যাং - যখন মহাদেব এক আলৌকিক সত্ত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
তাই বোঝ, তোমার জীবনে বহন করা সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ নির্ধারণ করে যে তুমি কি প্রকারের জীবনযাপন করেছ। তোমার সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ তোমার আবেগগুলির জন্য দায়ী - তোমার ক্রোধ, শান্তি, আনন্দ, বিনম্রতা, কোমলতা, পরমজ্ঞানের আলোকপ্রাপ্তি বা আঁধারপ্রাপ্তি, অজ্ঞতা - প্রতিটি জিনিষের জন্য তোমার সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ দায়ী। কতবার এবং কি প্রকার সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ তোমার তন্ত্রে (সিস্টেম) ঝারবার ঘটে, সে সম্পর্কে সজাগ হও। দুঃখকষ্ট সম্পর্কিত তোমার প্রত্যক্ষকরণ কত প্রবল এবং কত ঘনঘন ঘটে? যখন তুমি সচেতনভাবে সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ পরিবর্তিত কর, তখন তোমার জীবনের গুণমান স্বতঃস্ফূর্তভাবে বদলে যায়।
তোমার সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণকে মাষ্টারের সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণে রূপান্তরিত কর। তোমার চেতনার গুণমান মাষ্টারের হয়ে যাবে। তখন চেতনার যে গুণমান তুমি বহন করবে তা মাষ্টারের চেতনার গুণমানে রূপান্তরিত হয়ে যাবে।
আমার অন্তরের গভীরতম আকাশ পূর্ণ নির্বিকল্প সদাসমাধিতে আছে। সেখানে কিছুই ঘটে না। কিন্তু যে আকাশে আমি তোমাদের সবার সাথে সম্পর্কিত হই ও তোমাদের সাথে কার্য করি, আমার সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণগুলি সর্বদাই হল এই উচ্চ চেতনার - মহাদেবের চেতনার,
Page 22
সদাশিবের চেতনার। তাই তুমি যখন একই সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ আঘভূত কর, তোমার চেতনা সদাশিব মহাদেবের স্তরে উন্নীত হয়।
সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণগুলি হল উপলব্ধিসমূহ। যখন তুমি নিজেকে সাদৃশ্য প্রত্যক্ষকরণের সাথে সারিবদ্ধ কর, তুমি উপলব্ধি কর।
- সম্পূর্ণতি দ্বারা দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর
মানুষের কষ্টভোগের কারণগুলির মধ্যে একটি হল সম্পূর্ণতি (Integrity, অখণ্ডতা) না থাকা। আমি বলতে পারি, তোমার সমস্ত সমস্যার সহজ সমাধান হল তোমাকে সম্পূর্ণ করা। তোমার সমস্ত শক্তিগুলিকে একই দিকে সুসংহত কর। প্রতিটি আত্মা, প্রতিটি সত্তাকে তোমার কেন্দ্র বলে অনুভব কর।
এই একটি ধারণাকে বোঝ; এটা একটি খুব শক্তিশালী ধারণা। আমাদের সমস্ত সমস্যার কারণ হল আমাদের জোর করার চেষ্টা, আমাদের জিদ করার চেষ্টা যে তোমার সত্তা অন্য কোনও সত্তা থেকে আলাদা এবং সেই সত্তাকে দেওয়া দুঃখকষ্ট তোমাকে স্পর্শ করবে না। তুমি নিজেকে পৃথক ভাব এবং তোমার ত্বকের বাইরে যা আছে তা আলাদা।
এই মনোভাবের সবচেয়ে খারাপ জিনিস হল, প্রখনে তোমার ত্বকের বাইরে ও ভিতরে যা আছে তা আলাদা করতে শুরু কর, কিন্তু আলাদা করার সেই মনোভাব সেখানে থেমে যায় না। সেটা তোমার তন্ত্রে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে ফেলে।
তারপর তোমার ভিতরেও তুমি তোমার বুদ্ধিমত্তা ও তোমার আবেগগুলিকে আলাদা করতে শুরু কর। তুমি তোমার আবেগগুলি ও তোমার সত্তাকে আলাদা কর। তুমি তোমার সত্তা ও তোমার চেতনাকে আলাদা কর। তুমি আলাদা করতে থাক, খও খও করতে থাক। যত বেশী বিভাজন কর, তত তুমি দুর্বল হও এবং আরও বেশী সমস্যা ও আরও বেশী শক্ত তোমাকে
Page 23
নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমি দেখেছি কিছু মানুষ অনুভব করে যে সমগ্র বিশ্ব তাদের শক্তি!
তাই বোঝ, মানুষের জীবনে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ কষ্টগুলির মধ্যে একটি হল সম্পূর্তি (integrity, অখণ্ডতা) না থাকার সমস্যা। আমি সম্পূর্তিকে বিভিন্ন স্তরে তোমাদের কাছে ব্যাখ্যা করব।
বুদ্ধবৃত্তির স্তরে, তোমার মাথার ভিতরে প্রতুর মানুষ বাস করছে! এক সময়ে, তোমার মন এটা করতে বলবে, আর অন্য সময়ে ঠিক তার উলটো করতে বলবে! তা পরিবর্তিত হতে থাকে, আর বিভিন্ন সময়ে ও ভিন্ন ভিন্ন সমাধান বার করতেই থাকে। এটাকে আমি বলি অসম্পূর্ণ বা খণ্ডিত বুদ্ধিবৃত্তি। যখন তুমি একটা সমস্যার জন্য একটা সমাধান পাও, তুমি সম্পূর্ণ হও।
যখন তোমার বুদ্ধিবৃত্তিকে সম্পূর্ণ কর, সেটা তোমার জ্ঞান হয়ে যায়। জ্ঞান তোমাকে জীবন সমাধানের দিকে পরিচালিত করে।
যখন তোমার আবেগগুলিকে সম্পূর্ণ কর, তা ভক্তির দিকে পরিচালিত করে, তুমি মহাজগতের সাথে সংযুক্তি অনুভব করবে।
যখন তুমি তোমার সত্তাকে সম্পূর্ণ কর, তা তোমাকে ধ্যানে পরিচালিত করে, তুমি মহাজগৎ সম্পর্কে উপলদ্ধি করবে।
বোধ, আবেগজনিত অনুভূতি (ভ/র/বেগ) সংযুক্তি এবং উপলদ্ধি - এই তিনটিই সম্পূর্তি দ্বারা ঘটে।
যখন তোমার বুদ্ধিবৃত্তিতে সম্পূর্তি সংযোজিত করা হয়, সেটা তোমাকে সঠিক জীবন সমাধানের দিকে পরিচালিত করে, তা তোমার সমস্যাগুলির সমাধান করে। আমি বলতে পারি, তা তোমার জীবনের সমস্ত সমস্যা মুছে ফেলে।
যখন তুমি তোমার আবেগগুলিকে সম্পূর্ণ কর, তা ভক্তি হয়ে যায়। যখন তুমি তোমার সত্তাকে সম্পূর্ণ কর, সেটা হয়ে যায় ধ্যান। তুমি সমগ্র মহাজগতকে উপলদ্ধি কর।
তাই তোমার জীবনে সম্পূর্তি সংযোজন কর এবং তুমি জীবনমুক্তি লাভ করবে ও দুঃখকষ্টকে অতিক্রম করবে।
গ) শ্রদ্ধার মাধ্যমে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর
জীবন সম্পর্কে তোমার উপলদ্ধির (perception) চারটি উপাদান আছে - যেভাবে নিজেকে উপলদ্ধি কর, যেভাবে মহাজগতকে উপলদ্ধি কর, যেভাবে মানুষ্য সমাজকে উপলদ্ধি কর এবং যেভাবে ঈশ্বরকে উপলদ্ধি কর।
এর প্রত্যেকটি সম্পর্কে তোমার বোধ (understanding) আছে - তোমার নিজের সম্পর্কে বোধ আছে, মহাজগৎ সম্পর্কে বোধ আছে, মানুষ্য সমাজ সম্পর্কে বোধ আছে এবং ঈশ্বর সম্পর্কে বোধ আছে।
কিন্তু তোমার বোধ (বা তোমার প্রত্যাশা) এবং তোমার প্রকৃত অভিজ্ঞতার পরস্পরের সাথে মেলে না! তোমার বোধ ও তোমার প্রকৃত অভিজ্ঞতার মধ্যে বৈষম্যকে আমি বলি দুঃখকষ্ট।
উদাহরণস্বরূপ, ঈশ্বর সম্পর্কে তোমার হয়ত কিছু বোধ আছে, কিন্তু জীবনে তোমার হতে কিছু এমন অভিজ্ঞতা আছে যা তোমার সেই বোধকে ঝাঁকিয়ে দেয়।
যদি এগুলির প্রত্যেকটি সম্পর্কে তোমার বোধ এবং সেগুলির ব্যাপারে তোমার প্রকৃত অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন রকম বৈষম্য না থাকে, তাহলে তুমি মুক্ত হলে।
যদি তোমার নিজের সম্পর্কে বোধ ও নিজের সম্পর্কে অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন বৈষম্য না থাকে, তাহলে তুমি মুক্ত। তুমি জীবনমুক্ত হলে।
যদি তোমার মহাজগৎ সম্পর্কে বোধ এবং মহাজগৎ সম্পর্কে তোমার প্রকৃত অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন বৈষম্য না থাকে, তাহলে তুমি পৃথিবী ও মহাজগৎ সমপর্কিত সমস্ত দুঃখকষ্ট থেকে মুক্ত হয়েছ। প্রকৃতি ও মহাজগতে কিছুই তোমাকে বিরক্ত করে না।
একইভাবে যদি মানব সমাজ সম্পর্কে বোধ এবং সেই মানব সমাজ সম্পর্কিত অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন বৈষম্য না থাকে, তাহলে
Page 24
তুমি স্বাধীন হয়েছ, মুক্ত হয়েছ।
যদি তোমার ঈশ্বর সম্বন্ধে ধারণা ও ঈশ্বর সম্বন্ধে তোমার অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন বৈষম্য না থাকে, তুমি মুক্ত হয়েছ। তোমার ঈশ্বর উপলব্ধি হয়েছে।
এই আক্সমি ঘটার জন্য সম্পূর্তি হল অনুঘটক (ক্যাটালিস্ট)। যখন তুমি সম্পূর্তি সংযোজিত কর বৈষম্যহীন অভিজ্ঞতার আক্সমি ঘটবে। যাই বৈষম্য থাকুক না কেন, কেবল তাতে সম্পূর্তি সংযোজন কর।
যদি শ্রদ্ধার সহকারে তোমার ধারণা থাকে যে কোন ঈশ্বর নেই, তুমি তবে মুক্ত। কিন্তু সেটা যদি শ্রদ্ধাশীল না হয়, যদিও তোমার ধারণা থাকে যে ঈশ্বর আছেন, তুমি বন্ধনে থাকবে। একদম স্পষ্ট হও, মুক্ত হওয়াকে সন্মব করে আন্তরিকতা। সেটা হল দুঃখকষ্ট না হবার জন্য আক্সমি ঘটার অনুঘটক বা এজেন্ট। অনুঘটক সঠিক শব্দ। শ্রদ্ধা হল মুক্তির আক্সমি ঘটার অনুঘটক।
এই সমস্ত বোধগুলিতে, সমস্ত সম্বন্ধগুলিতে শ্রদ্ধা ঢেলে প্রাবিত কর।
যখন মহাজগতের সাথে তোমার নিজের সম্বন্ধতায় শ্রদ্ধা ঢেলে প্রাবিত কর, সেটা জ্ঞান হয়ে যায়।
যখন ঈশ্বরের সাথে তোমার নিজের সম্বন্ধতায় শ্রদ্ধা ঢেলে প্রাবিত কর, সেটা ভক্তি হয়ে যায়।
যখন মানবতার সাথে তোমার নিজের সম্বন্ধতায় শ্রদ্ধা ঢেলে দাও, তা হয়ে যায় সেবা।
যখন তোমার আত্মার নিজের সাথে সম্বন্ধতায় শ্রদ্ধা ঢেলে দাও, তখন সেটা ধ্যান হয়ে যায়।
জগৎ, ঈশ্বর, স্বয়ং ও সমাজ সম্বন্ধে তোমার বোধ জলের মত তরল। যদি তুমি শ্রদ্ধা অনুঘটক সংযোজন কর, তাহলে আক্সমি ঘটে। কিছু একটা ঘটে যাতে জল ঘনীভূত হয়। সেটা শক্ত বরফের মত হয়ে যায়
যার ওপরে তুমি হাঁটতে পার। সেটা এক সেতু হয়ে যায়। তুমি ও সমাজের মধ্যে সেই সেতু হল সেবা। তুমি ও মহাজগতের মধ্যে সেতুটি হল জ্ঞান। তুমি ও ঈশ্বরের মাঝে সেতুটি হল ভক্তি। তুমি ও তুমির মধ্যে সেতুটি হল ধ্যান। এই চারটি হল জীবনমুক্তি ও দুঃখকষ্ট-হীনতার পথ।
প্রক্রিয়া
শ্রদ্ধা সংযোজন কর
তোমার জীবনের চারটি অঙ্গুলের প্রতিটিতে শ্রদ্ধা সংযোজিত করার জন্য নীচে একটি শক্তিশালী ধ্যান দেওয়া হল।
ক) নিজের সাথে একলা বসো এবং বিশ্ব ও মহাজগৎ সম্পর্কে তোমার সমস্ত ধারণাগুলিকে লিখতে শুরু কর।
খ) এখন আন্তরিকভাবে বিশ্লেষণ করতে আরম্ভ কর, ‘আমি কি এই সব ধারণাগুলিতে শ্রদ্ধাশীল? নাকি আমি যা বিশ্বাস করি ও আমি যা অভিজ্ঞতা করি তাতে বৈষম্য আছে?’
গ) যদি বৈষম্য থাকে সেটাকে বিশ্লেষণের পরের ধাপে নিয়ে যাও। বিশ্লেষণ করা শুরু কর, ‘আমার ধারণাগুলো কি ঠিক? নাকি সঠিক ধারণাগুলির দিকে তাকানো ব্যাপারটাকে আমি এড়িয়ে যাচ্ছি?’
ঘ) তারপর বসে থেকে তোমার নিজের সম্পর্কে তোমার ধারণাগুলিকে লিখে ফেল। খোঁজ কর, ‘আমি এই সমস্ত ধারণাতে শ্রদ্ধাশীল? নাকি আমি যা বিশ্বাস করি ও আমি যা অভিজ্ঞতা করি তাতে বৈষম্য আছে?’
ঙ) এভাবে মানবতা ও সমাজ সম্পর্কে তোমার ধারণাগুলিকে লিখে ফেল। তাতে শ্রদ্ধা সংযোজিত কর। খোঁজ কর, ‘আমি কি সত্যি এই ধারণাগুলিকে বিশ্বাস করি, নাকি আমি কেবল এগুলিকে বিশ্বাস করার অভিনয় করছি? নাকি আমি সঠিক ধারণাগুলির দিকে তাকানো
Page 25
ব্যাপারটাকে এড়িয়ে চলছি?' বেশিরভাগ সময়ে আমরা সত্যে থাকতে চাই না। আমরা হয় খুব পরিশ্রান্ত অথবা খুব অলস। আমরা ভাবি, যেহেতু আমরা শ্বাস নিচ্ছি, আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। না! জীবনকে উপার্জন করতে হবে। শ্বাস অঙ্গগুলির কাজকর্ম তো তোমার মধ্যে ঘটা এক আকস্মিক ঘটনা। তার অর্থ এই নয় যে তুমি বেঁচে আছ। তার অর্থ এই নয় যে তুমি সজীব। তাই এই চার অঙ্গুলে শ্রদ্ধা ঢেলে প্রাণিত করে ফেল : নিজের সাথে তোমার সম্পর্কতা, অপরের সাথে তোমার সম্পর্কতা, বিশ্ব ও সমাজের সাথে তোমার সম্পর্কতা এবং মহাজগতের সাথে তোমার সম্পর্কতা। যখন এই চারটির সবকটিকে তাদের সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপে অভিজ্ঞতা করা হয়, সেটাই তো জীবনমুক্তি এবং তুমি দুঃখকষ্ট অতিক্রম করে যাও।
৬) দায়িত্বের মাধ্যমে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর অনেক সময় আমাদের দুঃখকষ্ট হয়ে কারণ আমরা আমাদের দেহ, আমাদের মন এবং আমাদের জীবনের মালিকানা নই না। দায়িত্ব আর কিছুই নয়, সেটা হল তোমার নিজের ও তোমার জীবনের মালিকানা নেওয়া। সেটা দুঃখকষ্ট থেকে বার হয়ে আসার এক শক্তিশালী উপায়। কিভাবে দায়িত্ব নিতে হয়? 'শরীরমাদ্যং খলু ধর্মসাধনম্' অর্থাৎ সমস্ত মহৎ কার্যের ভিত্তি হল শরীর। তোমার দেহের মালিকানা গ্রহণ কর এবং অনুভব কর যে সেটা তোমার। এই বোধ বহন কর, 'চলো, দেহটাকে এই প্রকার রাখতে আমি আপ্রাণই নই! আমি এমন এক দেহের ভিতরে বাস করতে চাই না যেটা নমনীয় ও স্বাস্থ্যবান নয়' শক্তি ও সময় ব্যয় কর এবং তোমার দেহকে যোগীর দেহ বানাও। এটা তো তোমার শরীর। সারাদিন তুমি এটার সাথে বাস করছ, এটা সম্পর্কে তুমি অবহিত কেন? সসমস্ত দিন ধরে তোমার সসমস্ত নড়াচড়া এমন হোক যাতে সেটা ক্রমাগত স্বাস্থ্যবান, সাবলীল ও মাধুর্য্যমন্ডিত হয়, সেটাই তো তুমি
সর্বদা চাইতে। যোগ সহকারে শরীর গঠন কর - যোগীর শরীর বানাও যাতে শরীরে কোন শারীরিক কষ্ট অথবা রোগ কখনও না ঘটে। একইভাবে তোমার মনের মালিক হও, সেটা তো তোমারই। মনকে এমনভাবে গঠন কর যাতে কোন দুঃখকষ্ট তোমাকে স্পর্শ করতে না পারে, কখনও যাতে তোমার কোন কষ্ট না হয়। কেবল এই ধারণাটি সর্বদা বহন কর, 'এটা আমার মন! চলো! এখন আমি এটাকে গঠন করছি যাতে কেউ আমাকে কোন কষ্ট দিতে না পারে, কোন কষ্ট যাতে আমাকে ছুঁতে না পারে!' নিজের মনের মালিকানা নাও। দ্যাখো যে চিন্তাগুলিকে তুমি জীবনপ্রদান কর সে-গুলিকে প্রাণিত করে তোলো, তা যেন তোমার জন্য কেবল আনন্দ নিয়ে আসে। তা যেন কখনও দুঃখকষ্ট অথবা অস্বস্তির না নিয়ে আসে। তুমি যেভাবে চাও সেভাবে মনকে সংশোধন কর, তাকে রচনা কর; তোমার ইচ্ছানত মনকে প্রশিক্ষণ প্রদান কর, তাকে পোষ মানাও যে মন জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করা সেটা হল বৈদিক মন। যে মন তোমার জন্য কোন দুঃখকষ্ট নিয়ে আসে না, সেটা হল বৈদিক মন।
একইভাবে তোমার বেঁচে থাকার মালিকানা গ্রহণ কর। এই বোধটি বহন কর, 'এটা আমার জীবন! চলো, এটার অধিকারী হওয়া যাক! এটাকে উপভোগ করা যাক! আমার যেভাবে ভালো লাগে সেভাবে অর্থ উপার্জন করব। যে সুখগুলি আমার ভালো লাগে আমি কেবল সেগুলিকেই রাখব। আমিই আমার জীবন পথকে বেছে নেব। প্রতিটি পদক্ষেপে আমি সচেতন থাকব এবং দেখব যে আমি যা চেয়েছি তা অর্জন করছি!' প্রতিটি কার্যে সচেতনতা প্রবিষ্ট কর : হাঁটাচলা, কথাবার্তা, বসা, নড়াচড়া ও শ্বাসপ্রশ্বাস - সবকিছুতে সচেতনতা সঞ্চার কর। প্রতিটি কার্য ধীরে কর। সেটাকে আরও সচেতনতা সহকারে কর। সচেতনতা প্রবিষ্ট করানোকেই আমি বলি ধ্যাননিষ্ঠ জীবন বা জেন্ জীবন।
তোমার এখন মালিকানা নেবার সময় এসেছে, 'আমার ইচ্ছা মত আমাকে পুনরায় সৃষ্টি করতে দাও! হয়ত অতীতে আমি অসফল হয়েছিলাম, কিন্তু এখন সময় এসেছে এটাকে আমার ইচ্ছামত রচনা করার, আমার ইচ্ছামত পঠন করার!' নিজের শরীরকে অধিকার কর, নিজের মনের মালিকানা নাও, নিজের জীবন
Page 26
৭) সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর
পৃথীপ্রহে কিভাবে দুঃখকষ্ট বিনা বাস করা যায়, সেটা এক বিরাট সমস্যা।
সম্প্রতি এক ভক্ত আসে ও আমাকে প্রশ্ন করে, ‘স্বামীজী, আমি অনুভব করি যে আমার স্বামী, আমার পরিবার, আমার ভাই, কোন আমার চারপাশে সবাই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, তারা আমার বিরুদ্ধে কাজ করছে।’
আমি বুঝতে পারলাম না। আমি ভাবলাম ‘হে ভগবান, এই মানুষটি কতই না অসুস্থ’ অবস্থাই সে অসহায় ছিল। এটা এই নয় যে সে সেটা সৃষ্টি করেছিল। সে অসহায়। সেখানেই আটকে গেছে। সমাজ থেকে পাওয়া সেটাই তার উপহার বা শান্তি।
মহান সন্ত বিবেকানন্দ একবার তার আধ্যাত্মিক গুরু শ্রীরামকৃষ্ণকে বলেছিলেন, ‘ঘুমাবার সময়ে আমি আমার সামনে আলোকের একটি গোলক অনুভব করি এবং সেটি আমার অন্তরাকাশে বিস্ফোরিত হয়, আমি তাতে প্রবেশ করি ও নিদ্রাগত হই।’
বিবেকানন্দ ভাবতেন যে সমস্ত বাচ্চারা এইভাবেই ঘুমায়! এই অভিজ্ঞতার জন্য তিনি নিজেকে কখনও বিশেষ কিছু ভাবতেন না। রামকৃষ্ণ খুব খুশী হয়েছিলেন ও তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার বিশেষত্ব জান না। যারা সাধারণ মানুষের সাথে তোমার তুলনা করতে পারে, কেবল তারাই তোমার বিশেষত্ব বুঝবে।’
আমি তোমাদের সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ শেয়ার করতে চাই। ঠিক যেমন বিবেকানন্দ ছোটবেলায় ঘুমানোর সময় সর্বদা অনুভব করতে ন যে তিনি আলোর চেতনাতে চলে যাচ্ছেন, আমার ছোটবেলাতেও আমার ভিতরে একটা প্রবল ও গভীর অনুভূতি হত। ছোটবেলা থেকেই সেই অভিজ্ঞতা আমার হত - এক অখন্ড চিত্তধারা। চিত্তধারাও নয়, সেটা এক অভিজ্ঞতা, এক চিন্তাশূন্যতা : সমগ্র বিশ্ব আমার উপস্থিতিকে উদযাপন করছে। সমগ্র বিশ্ব আমার অস্তিত্বকে সহায়তা করছে। যে জন্য আমি জন্ম
নিয়েছি, তার জন্য সমগ্র বিশ্ব সহায়তা ও পরিপূর্ণ করছে। এই একটি অভিজ্ঞতা, এই একটি অভিজ্ঞতা এক নিরন্তর অনুপ্রেরণা ছিল।
যখনই আমি সমাধি বা বিশ্রাম বা নিদ্রার মাধ্যমে রিল্যাক্স করি, তখন আমার এক প্রবল আত্মবিশ্বাস, স্পষ্ট অভিজ্ঞতা থাকে : এই সমগ্র মহাজগৎ হল আমরই নীল! আর আমি যা করছি তাতে সবাই সাহায্য করছে। আমি করছি তাতে সবকিছুই সহায়তা করছে।
অচেতন, ভগবানীপুর সমাজ অনবরত তোমাকে ভয় অনুভব করায়। ভগবান সমাজ থেকে প্রেরণ যে জিনিষটা তুমি শেখ তা হলে, কেউ অন্যেরা যখনই তুমি প্রথম হতে পার; অন্যেরা অসফল হলে তুমি সফল হতে পার। তার অর্থ, জেতার জন্য তোমাকে অন্য সবাইকে পরাজিত করতে হবে। স্কুলে প্রথম দিনে তুমি এই শিক্ষাই প্রাপ্ত কর। অন্যের হারাতে না পারলে তুমি জয়ী হবে না।
পুরো প্রণালীটাই গভীর প্রতিহিংসাকে উৎসাহিত করে। এই সিস্টেম তো প্রচন্ড ঈর্ষাকে উৎসাহিত করে। অন্য সত্তাদের সাথে অপব্যবহার করতে, তুমি ও অন্যেদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করতে এবং শারীরিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগত ইমারেখা টানতে এই সিস্টেম উৎসাহিত করে।
প্রথমে তারা তোমাকে শেখায় তুমি, তুমি, তুমি। তুমি ছাড়া অন্য সবকিছু হল শত্রু। সবকিছু কেবলমাত্র ‘তুমি’-কে কেন্দ্র করে হতে থাকে। অবিরাম সমাজ তোমাকে প্রতিটি পদক্ষেপে শেখাতে থাকে যে অন্য মতাদর্শের মানুষগুলিকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত তুমি শান্তিতে বাস করতে পার না। এটা বোঝা, এটাই হল মানুষকে সমাজের দেওয়া সবচেয়ে খারাপ শান্তি।
যখন তুমি ভাব যে কেউ তোমার সহায়তা করছে না, যখন তুমি অনুভব কর যে সবাই তোমার শত্রু, স্বভাবত তুমি কাউকে সমৃদ্ধ করার জন্য কার্য করবে না। তুমি কাউকে যত্ন করতে যাবে না। আমি তোমাদের বলি, মানুষ চেতনার এটাই সবচেয়ে বড় কষ্টভোগ : ধারণা যে সবাই তোমার শত্রু। সমগ্র বিশ্বকে তোমার শক্ত বলে অনুভব করা হল তোমার অভিজ্ঞতা করা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুঃখকষ্ট।
Page 27
অদ্বৈতের আকাশ থেকে সমৃদ্ধ কর
এই কষ্টের একমাত্র সমাধান হল অদ্বৈতের আকাশ থেকে অন্যদের সমৃদ্ধ করতে শুরু করা। আমি তোমাদের বলি, আমি সত্যি সত্যি ইচ্ছা করি আমার সেই ভাবনাটি তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করুক - যে সবকিছুই আমাকে সহায়তা করছে।
বাস্তবিকভাবে আমি অনুভব করি, এমনকি হাঁটার সময়তেও, যে বৃক্ষসকল, প্রাণীরা, সবকিছুই আমার মিশনকে সহায়তা করছে। আমি সবকিছুর অংশ এবং সবকিছু আমার অংশ। তাই স্বাভাবিকভাবে আমি সবাইকে ও সবকিছুকে সমৃদ্ধ করতে থাকব এবং তারা আমাকে সমৃদ্ধ করবে।
যে করেই হোক, এই অভিজ্ঞতাটি যদি আমি তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করাতে পারি, তাহলে বলতে পারি যে এটা সামাজিক ভগবানের বিষপ্রতিষেধক (অ্যাণ্টি-ভেনম)। তুমি বুঝবে সমগ্র মহাবিশ্ব তোমাকে পরিপূর্ণ করেছে, তোমাকে উদ্যাপন করছে।
৮) ত্যাগের মাধ্যমে দুঃখকষ্ট অতিক্রম করা
আমাকে ত্যাগের সংজ্ঞার্থ দিতে দাও। জীবন থেকে তোমার পাওয়া ধাক্কাগুলিকে বেদনা বা ক্রোধ বা অপরাধবোধে রূপান্তরিত না করা হল ত্যাগ।
তিন স্তরের ত্যাগ আছে।
নির্দিষ্ট কিছু সুখের প্রত্যুত্তরে ত্যাগ হল নিম্ন স্তরের ত্যাগ, সেটাকে ত্যাগও ঠিক বলা যায় না, সেটা তো কারবার হয়ে গেল।
নির্দিষ্ট কিছু উচ্চ স্তরের সুখ, যথা জীবনমুক্তির জন্য ত্যাগ করা হল পরের স্তরের ত্যাগ। তার অর্থ, এই ধারণা সহকারে ত্যাগ : ‘একবার আমি সবকিছু ত্যাগ করলেন, আমি পরমকে প্রাপ্ত করব।’ এটা অনেক আধ্যাত্মিক অভিযাত্রিকদের ত্যাগ।
পরের স্তরের ত্যাগ হল - কোন কারণ বিনাই কেবল ত্যাগ নিকিরণ করা।
Page 28
প্রক্রিয়া
বিশ্বের দুঃখকষ্টকে শ্বাসের সাথে ভিতরে নাও
বৌদ্ধদের একটি সুন্দর প্রক্রিয়া আছে। সেটা এক শক্তিশালী প্রক্রিয়া - সেটা হ'ল, সমস্ত দুঃখকষ্ট ও বেদনা, ক্রোধ ও বিশ্বের নকরাত্মকতাকে শ্বাসের সাথে ভিতরে নেওয়া এবং সমস্ত সকরাত্মক মঙ্গলময় জিনিষগুলিকে শ্বাসের সাথে বাইরে বার করা। সব খারাপকে শ্বাসের সাথে ভিতরে টেনে নাও, আর সমস্ত ভাল শ্বাসের সাথে বাইরে বার কর - কারণ সব খারাপকে ভালোবেসে রূপান্তরিত করার সামর্থ্য তোমার হৃদয়ের আছে। তোমার হৃদয় একটি বিশুদ্ধ হীরা। যা কিছু কর ও তোমার হৃদয়ে স্পর্শ কর, তা বিশুদ্ধ হয়ে যায়।
রামায়ণে সীতার ত্যাগ দেখো! দেখো, রামের মত এক ব্যক্তিত্বের সাথে বাস করা এক পরম আনন্দের ব্যাপার। কিন্তু তাঁর (সীতা) কোন প্রকার ক্রোধ ছিল না যখন তাকে রামকে ছেড়ে দিতে হয়। আমি বলতে পারি, সীতা এই প্রক্রিয়ার মূর্তরূপ - শ্বাসের সাথে ভিতরে বিশ্বের সব দুঃখকষ্ট, ব্যাখাবেদনা ও নকরাত্মকতা নেওয়া এবং শুধুমাত্র অসাধারণ আনন্দ ও প্রেম বিকিরণ করা। কি অসামান্য এই ত্যাগ!
আমি এক ভক্তের সাথে কথা বলছিলাম। তার মেজাজ ভাল ছিল না। আমি তাকে বললাম - দেখো, যদি পৃথিবীর ওপরে জঞ্জাল রাখ, তা থেকে দুর্গন্ধ হবে, রোগ ছড়াবে; কিন্তু তা না করে যদি তা তোমার গভীরে রাখলে না হয়! দুঃখকষ্ট, বেদনা, যন্ত্রণাকে যত্নবিহীন রাখলে তাতে দুর্গন্ধ হবে। তাকে ভিতরে রাখ ও গভীর চিন্তা কর।
তোমার আনন্দগঙ্গা চক্র হ'ল স্পর্শমণি - দুঃখকষ্ট যাই হোক না কেন, যেই মুহূর্তে তা স্পর্শ করে, তা অসাধারণ আনন্দ ও শান্তিতে রূপান্তরিত
হয়ে যায়। তোমার চারপাশে সবাই, তোমার পরিবারের, তোমার সমাজের ভিতরে নাও। যখন তুমি শ্বাস বাইরে ছাড়ছ, সেটা ইতিমধ্যে সকরাত্মক প্রত্যক্ষ কর - জীবনে তুমি কতই না সকরাত্মকতা পাবে।
ভালবাসার জীবন যদিও তোমাকে ছিড়ে ফেলে থাকে, তাকিয়ে দেখো, জীবন দ্বারা কে না টুকরা হয় নি? সন্ত, নবী, ঈশ্বরপুত্র অথবা ঈশ্বর নিজে নেয়ে এলেও তাঁদের ছিঁড়ে ফেলা হয়। একমাত্র তফাৎ হল - তাঁদের ছিঁড়ে ফেলার সময়েও তাঁরা তাঁদের ভালোবেসে প্রেম করলেন। সেটা হল শক্তিমত্তা। তোমরা সেই আনন্দগঙ্গায় প্রাপ্ত কর। আনন্দগঙ্গা এতই শক্তিপূর্ণ যে তা প্রত্যেকের যন্ত্রণা দূর করে যেই মুহূর্তে কেউ তার শ্বাসের অঞ্জলে আসে এবং মানুষটিকে অসামান্য প্রফুল্লতা ও আনন্দ প্রদান করে। কেবল তখন তুমি বাসযোগ্য হও। তুমি ঘরকে বাসযোগ্য কর, গাড়িকে বাসযোগ্য কর। কিন্তু তুমি তো নিজেকে বাসযোগ্য কর না। সময় এসেছে আমাদের নিজেদের বাসযোগ্য তৈরি করতে হবে।
দুঃখকষ্টের নিজের কোন গুণ নেই। দুঃখকষ্ট যখন ত্যাগের প্রক্রিয়াকে তুরীয়ত করে, তখন তোমাকে এই চিন্তন করতে জোর করা হয়। যদি তুমি বাহ্যিক দুঃখকষ্ট ছাড়া গভীর চিন্তন ও রূপান্তরণ করতে পার, তাকে তপস্যা বলে। তোমার মধ্যে ত্যাগ ঘটার জন্য বাহ্যিক দুঃখকষ্টের প্রয়োজন নেই। দুঃখকষ্ট ছাড়া কেবল গভীর চিন্তন ও রূপান্তরের মাধ্যমে ত্যাগকে তুরীয়ত করা যায়।
Page 29
৯) পূর্ণত্বের মাধ্যমে দুঃখকষ্ট অতিক্রম কর
পূর্ণত্ব বলতে আমি কি বলতে চাইছি তা বোঝার আগে তোমাকে প্রথমে জানতে হবে অপূর্ণতা কি।
শ্রবণ কর : যে কার্য বহিঃস্থ বা অন্তঃস্থ বাধার কারণে তোমার কলপনা অনুসারে অপূরিত, সেটা অপূর্ণ!
তোমার প্রত্যাশাগুলো তোমার দ্বারা বা অপরের দ্বারা পূরিত না হলে সেগুলি তোমার ভিতরে অপূর্ণতা হয়ে থেকে যায়।
যা কিছু তোমাকে দুঃখকষ্ট, অস্বস্তিহীন, খারাপ মেজাজ ও অতৃপ্তির এক ভাবনা প্রদান করে, তা হল অপূর্ণতা।
এই সময়ে তোমার জীবন হল অপূর্ণতা থেকে অপূর্ণতায় যাত্রা, কষ্ট থেকে কষ্টে যাত্রা। এমনকি তোমার জীবনের তথাকথিত সকলকার্যকর ঘটনাগুলিও অপূর্ণতার ফলাফল। তোমার সফলতা, তোমার সমৃদ্ধতা, তোমার ধনসম্পদ -সবকিছুই এক অপূর্ণতার বোধ থেকে উত্থিত।
তুমি তো এক সচেতন সত্তা, তাই অপূর্ণতা হল তোমার বহন করা সবচেয়ে খারাপ অস্ত্র। অপূর্ণতা এই পূর্বধারণা থেকে আসে যে তোমার চেয়ে বড় কিছু আছে এবং সেটা তোমাকে পূর্ণ করতে পারে।
বাইরের কিছু তোমাকে পূর্ণ করতে পারে, তোমাতে সংযোজন করতে পারে, তোমাকে পরিতৃপ্ত করতে পারে - এই ধারণা তোমাকে জড়বস্তুর স্তরে নামিয়ে আনে।
কিন্তু তুমি তো জড় নও - তুমি জীবন! কেবল জীবন জড়তে জীবন সঞ্চার করতে পারে; জড় কিন্তু জীবনে জীবন প্রবিষ্ট করাতে পারে না!
কেবল তুমি তোমার বাইরে কিছু মূল্য নির্ধারণ করতে পার; বাইরের কোন কিছুই তোমার মূল্য নির্ধারণ করতে পারবে না।
তুমি উপলদ্ধি কর কি না কর, তুমি নিজের মধ্যেই পূর্ণ। তাহলে বাইরের কিছু তোমাকে পূর্ণ করবে বলে সেগুলির দিকে তাকাও কেন ?
তুমি ইতিমধ্যেই পূর্ণ - সেটা না জানাই হল তোমার বহন করা একমাত্র
প্রকৃত অপূর্ণতা! এই অপূর্ণতাই নিজেকে প্রকাশ করে ভয়, লোভ, ক্রোধ, ঈর্ষা, নকারাত্মক মানসিক চক, বিষণ্ণতা - তোমার সমস্ত দুঃখকষ্ট হয়ে।
আমি বলছি না যে সফলতা ভুল, ধনসম্পদ ভুল। কিন্তু সেগুলির পিছনে এক অপূর্ণতার অনুভূতি সঞ্চারিত দৌড়ানো ভুল।
অপূর্ণতা তোমার জীবনে এক বিষ। অপূর্ণতাই তোমাকে এক জন্ম থেকে অন্য জন্মে চালিত করে। যেকোন অপূর্ণ কার্য হল কর্ম। যতক্ষণ না পূর্তি প্রাপ্তি করছু, কর্ম তোমাকে সেই কার্য পুনরাবৃত্তি করতে বারংবার টেনে আনবে।
বোধ, বর্তমান মুহূর্তে অপূর্ণতা কথনও থাকতে পারে না, কারণ জীবন বর্তমান মুহূর্তে ঘটে। ঘটার মুহূর্তে, পরিমাপ করার জন্য কোন মানবিন্দু থাকে না যে তুমি কম না বেশি সফল, কম না বেশি ধনী, কম না বেশি সুখী। বর্তমান মুহূর্তে এগুলিকে তুমি কার সাথে তুলনা করে পরিমাপ করতে পার? সমস্ত প্রসঙ্গ ও অনুমানগুলি (রেফারেন্স ও ইনফারেন্স) তো কেবল অতীত থেকে করা যায়। সেইজন্যই তোমার সমস্ত নকারাত্মকতা অতীতে শিকড়িত। অতীতের প্রকৃতি অনুযায়ী তাতে জীবন নেই। কিন্তু তুমি অবিরাম অতীতকে প্রশ্রয় দিতে থাকলে, অতীত ভবিষ্যতকেও পিলে ফেলবে। সমস্ত নকারাত্মকতা অতীতেই শিকড় গেড়ে আছে।
Page 30
পূর্ণত্বের তিনটি প্রক্রিয়া
১) স্বপূর্ণত্ব ক্রিয়া : নিজের সাথে পূর্ণত্ব করার প্রক্রিয়া একটা আয়নার সামনে আমরা করে বসো। আয়নাটা যেন তোমার সম্পূর্ণ প্রতিফলন দেখতে পারার জন্য যথেষ্ট বড় হয়। তোমার শরীর ও তোমার প্রতিফলনের মধ্যে গভীরভাবে চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ বজায় রাখ। দয়া করে বোঝ, দুটো মিলিয়ে হলে ‘তুমি’! আমি এটাকে বলব কায়া ও ছায়া - দেহ ও তার প্রতিফলন। দুটো মিলিয়ে হলে ‘তুমি’! তাই কায়া ও ছায়া গভীরভাবে চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করুক। যেই মুহূর্তে গভীরভাবে চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ কর, প্রথমে চোখে জল আসবে! আসতে দাও। তুমি তো নিজেকে নিয়ে আদর করতে ও কাঁদতে অপেক্ষা করছিলে। তুমি নিজের ওপরে কত কিছুই না করেছ এবং অন্যেরাও তোমার ওপরে করেছে, তুমি ও অন্যেরা তোমার ওপরে কতই না অভিচার করেছ - তার জন্য নিজেকে জড়িয়ে আদর কর এবং নিজের সাথে কাঁদ...তুমি তো কাঁদার জন্য অপেক্ষা করছিলে। তোমার ছায়াকে আদর করতেই থাক। তাকে ধর। প্রথমে নিজের হৃদয়ের কান্না শ্রবণ করতে শেখো। বেশীরভাগ সময়ে তুমি তো নিজেকে শোনই না!
আয়নার সামনে বসে কথা বল; নিজেকে যা কিছু বলতে ইচ্ছা হয় বলো। নিজের সঙ্গে সময় কাটাও। কথা বলো। অনেক কথা বলো। যখন কথা বলো, আয়নার ভিতরের ব্যক্তি হয়ে শ্রবণ কর। শ্রবণ করতেই থাক! আয়নার মানুষটির সাথে কথা বল, আয়নার মানুষটিকে শ্রবণ কর।
শ্রদ্ধা সহকারে তোমার হৃদয়ের ক্রন্দন শ্রবণ কর। তোমার হৃদয় তো তোমার শ্রবণের জন্য কাঁদছে। পূর্ণ কর, পূর্ণ কর, পূর্ণে কর। এখন সবচেয়ে পুরাতন স্মৃতিকে শনাক্ত করার চেষ্টা কর যেটা তোমার মধ্যে এই অপূর্ণতা-বোধ সৃষ্টি করেছে, তোমার দুঃখকষ্টের মূল ছক (প্যাটার্ন) বানিয়েছে। প্রথম যখন দ্বন্দ্ব অভিজ্ঞতা করেছিলেন, জীবনের সেই প্রথম পরিস্থিতিতে ফিরে যাও। এই পরিস্থিতি সাধারণত তোমার তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ঘটে থাকবে। সেই পরিস্থিতিতে অতীত পুনর্যাপন (relive, পুনরায় বাস) কর। ক্রোধ এলে আসতে দাও; ক্রোধ এলে আসতে দাও। তোমার অতীতের সাথে মুখোমুখি হয়ে দৌড়ালে বেদনা মুছে যায়, ক্রোধ মিলিয়ে গেলে তা প্রেমে পরিণত হয়। দয়া করে বোঝ, ক্রোধ হয়ে প্রকটিত শক্তি থেকে ক্রোধকে সরিয়ে নিলে সেটা পুরোপুরি প্রেম হয়ে যায়, কারণ তখন শক্তি থেকে লব্ধার শুড়ো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কেবলমাত্র মূল প্যাটার্নের ওপর কাজ করলে পূর্ণত্ব ঘটবে না : মূল প্যাটার্ন থেকে যে সব পরিস্থিতি উৎত হয় তাদের সাথেও পূর্ণত্ব করতে হবে। দয়া করে বোঝ, তোমার শৈশবের সবচেয়ে পুরাতন স্মৃতিতে ফিরে যেতে হবে এবং সেই স্মৃতিটির সাথে পূর্ণত্ব করতে হবে। আর তারপর আজ পর্যন্ত সৃষ্ট তোমার প্রতিটি প্যাটার্নের সাথে পূর্ণত্ব কর। প্রক্রিয়াটির শেষে তুমি অনুভব করবে যে বহু বছরের বেদনা চলে গেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি ভাব যে এই অভ্যাসের প্রয়োজনীয়তা আছে, এটি রোজ রাতে চালিয়ে যাও। এটা যখন তোমার জন্য আর প্রয়োজন না হলে, এটা তোমার মধ্যে স্বতঃকলভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
Page 31
২) পূর্ণত্ব ক্রিয়া : অপরের সাথে পূর্ণত্ব করার প্রক্রিয়া
যখন তুমি শ্রবণ-আকাশ থেকে শ্রবণ করার জন্য প্রস্তুত, তখন অন্যের সাথে পূর্ণত্ব করা আরম্ভ কর।
যাদের কথা ও কাজ তোমার জীবনে নকারাত্মক প্রভাব ফেলেছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের চিহ্নিত কর। তাদের সাথে দেখা কর, তাদের কল কর, তাদের সাথে কথা বলার জন্য উপায় বার কর।
প্রতিটি মানুষের সাথে পূর্ণত্ব করো থাকা। সেই মানুষটির সাথে সরাসরি পূর্ণত্ব না করতে পারলে, আয়নাতে পূর্ণত্ব কর - প্রত্যক্ষ কর যে তুমি তাদের সাথে কথা বলছ ও পূর্ণত্ব করছ। প্রতিটি মানুষের সাথে, প্রতিটি প্যাটার্নের সাথে, প্রতিটি অপূর্ণতার সাথে, বেদনার প্রতিটি স্মৃতির সাথে এই পূর্ণত্ব ক্রিয়া অভ্যাস করতে থাক।
কমপক্ষে এক বছর ধরে পূর্ণত্ব ক্রিয়াকে এক আধ্যাত্মিক অভ্যাস হিসাবে করতে হবে।
যখন তুমি নিজের মধ্যে অস্বস্তিরতা অনুভব কর, আয়না নিয়ে বসো ও পূর্ণত্ব কর। যখন অন্য কোন মানুষের সাথে দ্বন্দ্ব অভিজ্ঞতা কর, তাদের সাথে যত শীঘ্র সম্ভব পূর্ণত্ব কর।
৩) সংস্কার দহন ক্রিয়া : সমস্ত অপূর্ণতা দগ্ধ করার প্রক্রিয়া
সংস্কার দহন ক্রিয়া একটি শক্তিশালী গ্রুপ-প্রক্রিয়া এবং সেটা স্বপূর্ণত্ব ক্রিয়া, পূর্ণত্ব ক্রিয়া এবং তাদের ছাড়িয়ে আরও কিছু।
এই প্রক্রিয়াটি পরমপুরুষ পরমহংস নিত্যানন্দ দ্বারা বছরে বহুবার পরিচালিত ইনার আওয়েকেনিং প্রোগ্রামের অংশ। অংশগ্রহণকারীরা এক অবতার পুরুষের শক্তিকেত্রের ভিতরে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। অনেক জন্মকালীন অপূর্ণতা ও কর্মগুলিকে দহন করার ক্ষমতা সেই শক্তিকেত্রের আছে।
সংস্কার দহন ক্রিয়া হল তোমার তন্ত্রে (সিস্টেমে) গভীরভাবে শিকড়িত পুরাতন সমস্ত অপূর্ণতা ও প্রবল বেদনার প্যাটার্নগুলিকে (সংস্কার) দগ্ধ করার প্রক্রিয়া। এই অপূর্ণতা ও বেদনাগুলিকে তুমি নিজে সঠিক প্রত্যক্ষকরণ অথবা বিপরীত এনগ্রাম অথবা নিজের সাথে ও অন্যের সাথে পূর্ণত্ব ক্রিয়া করে পূর্ণ করতে পার না।
যদি তুমি আধ্যাত্মিক অভ্যাস সম্পর্কে খুবই আন্তরিক ও ঐকান্তিক হও, কেবল আটচল্লিশ দিন ধরে রোজ রাতে ঘুমাবার আগে সংস্কার দহন ক্রিয়া কর। তুমি এটা এক সপ্তাহ ধরে করে কয়েকদিন বিরাম নিয়ে আবার এক সপ্তাহ ধরে করবে।
Page 32
সপ্তাহ ধরে করতে পার। এইভাবে করে যাও। প্রথম প্রথম দিনে দুই থেকে তিন ঘন্টা লাগতে পারে, কিন্তু কিছু সময় পরে তোমাকে ২১ মিনিটের বেশী অভ্যাস করতে হবে না। কেবল আটচল্লিশ দিনের সংস্কার দহন ক্রিয়া তোমার ভিতরের হাজার হাজার বেদনার প্যাটার্নকে সমাধান করতে পারে।
সংস্কার দহন ক্রিয়ার চারটি স্তর আছে।
বলে বসে তোমার বেদনার সমস্ত প্যাটার্নগুলিকে লিখে ফেলা।
সেগুলিকে তোমার অন্তর আকাশে পূনর্যাপন (relive) করা।
আয়না ব্যবহার করে সেগুলির মধ্য দিয়ে পূনর্যাপন করা।
অন্যের সাথে বসে সেগুলিকে শেয়ার করা এবং যখন তারা শেয়ার করে তা শ্রবণ করা ও শ্রবণ করে তাদের পূর্ণত্ব করতে দেওয়া।
নির্দেশাবলী
সংস্কার দহন ক্রিয়া একটি সর্বাঙ্গীণ পূর্ণত্ব প্রক্রিয়া। যখন তুমি বসো ও অতীত পূনর্যাপন কর, কখনো কখনো তুমি কিছু ঘটনা হারিয়ে ফেল, তুমি গভীরতা হারাও, তুমি বেদনার যথামথ প্যাটার্নটিকে ধরতে পার না। কিন্তু সংস্কার দহন ক্রিয়া খুবই শক্তিশালী প্রক্রিয়া।
প্রথম কিছু দিন, যখন তুমি বসো ও লেখো আগের সমস্ত বেদনাগুলি অনেক বেশী বেশী করে সামনে আসবে। তিন চার দিন পরে, সেই ব্যাথাবেদনাগুলির কোন ক্ষমতা তোমার ওপরে থাকবে না। তখন যা কিছু তোমার স্মরণে আসে কেবল সেগুলি লেখো। যা কিছু সত্য, যা কিছু এখনও তোমাকে ব্যাথা দিচ্ছে কেবল সেগুলি লিখে ফেল।
এই অনন্য শক্তিশালী পূর্ণত্ব ক্রিয়াতে চারটি ধাপ আছে :
১) তোমার জীবনের সবচেয়ে আগের স্মৃতিগুলিকে লিখতে শুরু কর, সমস্ত বেদনার প্যাটার্নগুলিকে, তোমার জীবনে অভিজ্ঞতা করা সমস্ত ব্যাথা বেদনাকে - শারীরিক ব্যাথা, মানসিক বেদনা, আবেগসংক্রান্ত বেদনা, মনস্তাত্ত্বিক বেদনা, সমস্ত বেদনাগুলিকে কলম দ্বারা লিখে ফেলো।
২) তোমার অন্তর আকাশে কমপক্ষে পাঁচবার প্রতিটি ঘটনাকে পূনর্যাপন কর। তাদের পূনর্যাপন কর ও সেগুলিকে মুক্ত কর; নিজেকে সেগুলি থেকে মুক্ত কর।
৩) তারপর যেভাবে স্বপূর্ণত্ব ক্রিয়াতে আয়না ব্যবহার করেছ, সেভাবে সেগুলিকে পূনর্যাপন কর ও মুক্ত কর।
৪) তারপর আরেকজন মানুষের সাথে বসে ও শেয়ার করতে থাক, যেভাবে তুমি স্বপূর্ণত্ব ক্রিয়াতে কর। কমপক্ষে পাঁচজন মানুষের পর্যতে কথ শেয়ার কর। একইভাবে শ্রবণ কর : এটা হল সবচেয়ে নিখুঁত ও সর্বাঙ্গীণ পূর্ণত্ব ক্রিয়া। হয়ত প্রথম চার পাঁচ দিন এটা করার সময় তুমি অনুভব করতে পার, ‘ও! বেদনাগুলি তো ফিরে ফিরে আসছে’
না! ‘ফিরে আসা’ বলে কিছু নেই। সেটা তোমাকে ছেড়েই যায় নি। যা কিছু তোমাকে ছেড়ে যায় তা বরাবরের মত ছেড়ে যায়। যদি কিছু ফিরে আসছে, তার অর্থ, সেটা তোমাকে ছেড়েই নি; সেটা তোমার ভিতরেই ছিল, গোপনে ছিল। তুমি সেটাকে অন্বকারে রেখে দিয়েছিলে, তার যত্ন নাও নি।
তোমার কাকীমা তোমার কাকুর পিছনে লুকিয়ে আছে, কাকু ঠাকুরদার পিছনে লুকিয়ে, ঠাকুরদা খামার পিছনে লুকিয়ে, খামার স্তম্ভের পিছনে লুকিয়ে, স্তম্ভ দরজার পিছনে লুকিয়ে, দরজাটা তোমারই পিছনে লুকিয়ে! এটা তো একে অন্যের পিছনে লুকিয়ে থাকার খেলা।
দয়া করে বোঝ, বিস্মৃত কিন্তু তোমার ভিতরে বসে থাকা অনেক বেদনার প্যাটার্ন যা তুমি ধরতে পার না ও সেগুলির গন্ধ পাও না, সেগুলিকে তুমি শনাক্ত করে ধরতে পারবে ও তাদের গন্ধ পাবে, কেবল যখন তুমি অন্যের সাথে শেয়ার করতে থাক। কারণ শেয়ার করার সময় তোমার সচেতনতা স্বাভাবিকভাবে বেশী থাকে এবং অনেক অনেক না বলা কারণ আছে। বসে তোমার শেয়ার করতে থাকা উচিত বেদনার তাজা প্যাটার্নগুলিকে যেগুলি তোমাকে সক্রিয়, সতেজ ও বৃদ্ধিমত্তাসম্পন্ন হতে দিচ্ছে না।
Page 33
তোমার জীবনের একদম আগের বেদনার স্মৃতিগুলি দ্বারা শুরু কর এবং তোমার জীবনের সমস্ত অপ্রীতিকর ঘটনাগুলিকে ফিরিয়ে আন এবং লিখে ফেলো। একবার লিখে ফেলে, নিজের অন্তরাকাশে সেগুলি পুনর্যাপন কর, তারপর আয়না ব্যবহার করে পুনর্যাপন কর এবং অন্য ব্যক্তিদের চোখকে শেয়ার করে পুনর্যাপন করার জন্য ব্যবহার কর। একইভাবে, অন্যের পূর্বত লাভ করার জন্য তুমি তোমাদের এক অংশ হয়ে যাও। প্রতি রাতে পূর্ত্তের পরে সেই কাগজগুলিকে পুড়িয়ে ফেল। বোধ, সংস্কার দহন ক্রিয়া হল বিশ্বশান্তি প্রসার করার ও মানবতায় শান্তি নিয়ে আসার জন্য বাস্তব উপায়।
Page 34
দুঃখকষ্টের কোন মূল্যই নেই
বৌদ্ধদের একটি সুন্দর সূত্র আছে : দুঃখ নেই, কারণ নেই, শেষ নেই।
পরিশেষে, এই সমস্ত প্রক্রিয়া ও পদচিহ্নের পরে তুমি উপলব্ধি করবে, তোমার কোনও দুঃখকষ্টেরই মূল্য নেই! তুমি শারীরিক সুখের জন্য কষ্ট পাচ্ছ বা তুমি তোমার ধনসম্পদের জন্য কষ্ট পাচ্ছ বা তুমি স্বাস্থ্যের জন্য কষ্ট পাচ্ছ - সেগুলির তো কোন মূল্যই নেই।
সবশেষে, দুঃখকষ্ট সম্পর্কে কেবল একটি সূত্র আছে - দুঃখকষ্টহীনতার সূত্র।
কৃষ্ণ সরাসরি এই শিক্ষাটি তাঁর শিষ্য অর্জুনকে প্রদান করেন : নানু শোচিতুম্ অর্হসি (ভগবদগীতা ২ঃ২৫)। শোক করো না। তার কোন মূল্য নেই।
কখনো কখনো মানুষেরা এত চতুর হয় যে তারা বলে, 'আমি আধ্যাত্মিক কারণের জন্য দুঃখকষ্ট ভোগ করছি' বোঝা আধ্যাত্মিকতা হল নানু শোচিতুম্ অর্হসি। দুঃখ করবে না। তার তো কোন মানেই হয় না!
উদাহরণস্বরূপ, যদি তোমার অনেক ধার করা থাকে অথবা গ্রামে তোমার অনেক শত্রু থাকে, হঠাৎ একসময়ে উপলব্ধি কর যে দূরের কোনও শহরে তুমি এক নতুন জীবন শুরু করতে পার। তুমি ভাব, 'আহা, পৃথিবী অনেক বড়। নতুন জায়গায় আমি এক নতুন জীবন পেতে পারি।' তাই তুমি নতুন জায়গায় উঠে যাও এবং স্বভাবতই তুমি তোমার সমস্ত কষ্ট থেকে মুক্ত হলে। তুমি তোমার ঋণ ও আগের গ্রামের
শত্রুদের পরোয়া কর না কিন্তু এখানে আবার তুমি নতুন ঋণ পাও এবং নতুন শত্রু বানানো শুরু কর, কারণ তুমি কেবল জায়গা পাল্টেছ, নিজেকে নয়! তুমি নিজের জন্য আরেকটা নরক বানাও তিন চার বছরের মধ্যেই তুমি নতুন এক নরক নির্মাণ করে ফেল। তারপর আবার যদি তুমি জান যে আরও বড় কোন শহর বা দেশ আছে যেখানে তুমি আরও একটি জীবন পেতে পার, তুমি লাফ দাও ও সেখানে চলে যাও দুঃখকষ্ট থেকে পালাবার জন্য তুমি তোমার আকাশকে প্রসারিত করতে থাক।
আমি তোমাদের বলি, যখন তুমি সত্যি সত্যি জান যে বিশ্ব বিরাট বড় এবং তোমার আকাশ সীমাহীন, তুমি দুঃখকষ্ট থেকে বার হয়ে যাও! মহাবিশ্ব খুবই বিশাল, আর তোমার অনেক চেয়েস (পছন্দ) রয়েছে। পৃথিবীগ্রহ এই বিরাট মহাজগতে যেন এক ছোট্ট গ্রহ। তাই যা কিছুকে তুমি তোমার দুঃখকষ্টের কারণ বলে দেখাও, তা তো এই মহাজগতে এক ধূলিকণার মত। যা কিছুকে তুমি দুঃখকষ্ট, পরম জ্ঞানালোক হীনতা, অজ্ঞতা, অস্বাস্থ্য, ধনসম্পদ হীনতা বলে জান, পরিশেষে তাদের কোন গুরুত্বই নেই। বাস্তব মহাজগত হল অব্যক্ত ও অচিন্ত্য - অপ্রতীয়মান এবং তোমার কল্পনাকে ছাড়িয়ে। এটা উপলব্ধি কর এবং দুঃখ কোরো না।
শেষে, আমেরিকাতে সমস্ত ভোগবিলাসের সাথে ধনাত্মক জীবন সহকারে বসবাস করতে থাকলে, যদি কখনও তোমার প্রাণের জীবনের কথা মনে কর, তুমি ভাববে, 'হে ভগবান! কি ফালতু কারণগুলির জন্য আমি কষ্ট পাচ্ছিলাম! আমি একদিন প্রতিবেশীর একটা সাইকেল চুরি করেছিলাম, আর সে আমাকে হাজার টাকার সেই অকেজো সাইকেলের জন্য কতই না পেটালো!' যখন তুমি শিখনে ফিরে তাকাও, দেখবে, যে সমস্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে তুমি গেছ তা সবই অর্থহীন, কারণহীন ও রসহীন।
জীবনমুক্তির পরে আমার দেহ স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসার পর আমি ঠিক এই প্রকার অনুভব করেছিলাম, 'হে ঈশ্বর, কতই না অপ্রয়োজনীয় কষ্ট আমি পেয়েছি!' রোজ রোজ খাওয়ায় চড়া, নাক ঝাড়া, এই প্রক্রিয়া করা, ওই প্রক্রিয়া করা...!
Page 35
আমি তোমাদের বলি, তোমার জীবন ও সময়ের কতই না তুমি অপচয় করেছ, সেটা বোঝার জন্য তোমার জীবনমুক্ত হবার দরকার নেই। এখনই বুঝে নাও যে পরম আকাশ হল অমৃত, অচিন্ত্য, অবিকার অর্থাৎ অপ্রতীয়মান, অকল্পনীয় ও অপরিবর্তনীয়। তাই দুঃখ করো না। শোক করো না। দুঃখ করো না। নানু শোচিতুম্ অহর্সি। কোন কিছুর জন্যই শোক করো না। নির্গয় নাও, ‘দুঃখকষ্টহীনতা আমার জীবনের নীতি।’
যখন তুমি এই একটি সঙ্কল্প কর, ‘আমি দুঃখকষ্ট পাব না’, তোমার দেহ, মন, জৈবস্মৃতি, পেশীস্মৃতি, সবকিছুই জীবনমুক্তির দিকে স্বতঃচলভাবে সারিবদ্ধ হয়ে যাবে। জীবনমুক্তি ছাড়া সবকিছুই তোমার জীবনে কোন না কোন সময়ে দুঃখকষ্ট দেবে। যখন তুমি বল ‘আমি দুঃখ পাব না’, স্বভাবত জীবনমুক্তি ছাড়া সবকিছু তোমার থেকে সরিয়ে ফেলা হবে। সেগুলি তোমাকে ছেড়ে যাবে। তুমি সেগুলিকে ছেড়ে দেবে !
তোমার দুঃখকষ্টকে ফেলে দেবার চার উপায়
১) স্বতঃস্ফূর্ত পূর্ণত্ব
ভেবো না দুঃখকষ্টহীনতার সত্যটিকে বোঝার জন্য তোমার জীবনমুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
তোমার কেবল সাধারণ জ্ঞান (কমন্ সেন্স) চাই - যেটা অবশ্যই অসাধারণ (আনুস্মরণ) ব্যপার! বুঝতে পার, নিজেকে সেটার সাথে শনাক্ত করার জন্য কেবল সহজ সাধারণ জ্ঞান চাই। যতটা তুমি বুঝতে পার, নিজেকে সেটার সাথে ততটা শনাক্ত কর। স্বতঃস্ফূর্ত পূর্ণত্ব ঘটে যখন তোমার সহজ সাধারণ জ্ঞান থাকে।
উপনিষদ ঘোষণা করে : প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম, বৃদ্ধিসত্বাই ঈশ্বর। আমি ঘোষণা করতে পারি : সাধারণ জ্ঞানই ঈশ্বর! সহজ সরল সাধারণ জ্ঞানই ঈশ্বর। আমি তোমাদের বলতে পারি, সহজ সাধারণ জ্ঞান তোমার দেহের আচরণকেও বদলে দিতে পারে। লোকেরা আমার কাছে গভীর বিষয়ত সহকারে এলে আমি যখन তাদের ভিতরের শক্তিধারা দেখি, দেখতে পাই তাদের সাধারণ জ্ঞান যে রকমই হোক হারিয়ে গেছে।
সাধারণ জ্ঞান হল তোমার নির্ণয় ও ধারণাগুলিকে পরিবর্তিত করার উন্মুখতা। চলো, জীবনের অনুকূল হও, তোমার সৃষ্টি করা নিরর্থক কঠিন নীতি দ্বারা আটকে যেও না। যদি কেউ তোমার জীবনে থাকতে না চায়, তাকে সহজেই বিদায় জানাও। হয়ে গেল! আর যদি কিছু কাজ না করে, তোমার ধারণাকে কেবল পালতে ফেল। হয়ে গেল! কিন্তু আমি যখম এটা সেই লোকেদের বলি, তারা বলে, ‘ও! সে কি করে সম্ভব?’
Page 36
সাধারণ জ্ঞান বলতে আমি কি জ্ঞান করছি সেটা বোঝা! পরিবর্তিত হবার জন্য একদম হালকা হও, স্বচ্ছ হৃদয় হও, নমনীয় হও। জীবন সেরকমই - তা বেশ! সরল হও! তরল হও! সহজ সাধারণ জ্ঞান রাখ! তুমি জীবনের সাথে প্রবাহিত হবে। তুমি বুঝবে, ‘আহা, জীবন তো এইরকমই! কি করা যায়?’ আমাদের বুদ্ধিভাষীল হওয়া যাক। আমাদের খাপ খাইয়ে নেওয়া যাক। আমাদের জীবন্ত হওয়া যাক!
কিন্তু যে করেই হোক লোকেরা অনুভব করে যে এটা একটা খুবই বড় কৃতিত্ব। না! এটা হল প্রথম সত্য যেটা আমি তোমাদের বলতে চাই। যেই মুহূর্তে তুমি বুঝতে পার যে সাধারণ জ্ঞান (কমন্ সেন্স) হল ঈশ্বর, তুমি দুঃখকষ্টকে অতিক্রম করে গেছ।
২) দুঃখকষ্টকে ‘না’ বল
আমি তোমাদের বলি, তোমাকে জীবনে কিছুই করতে হবে না। তোমার যোগ প্রয়োজন নেই। তোমার ধ্যান প্রয়োজন নেই। তোমার প্রাণায়াম প্রয়োজন নেই। তোমার ভক্তির দরকার নেই। কেবল এই একটি সংকল্প কর : ‘আমি দুঃখ পাব না’, ব্যাস। তোমার মধ্যে কোন দুঃখকষ্টকে অনুমতি দেবে না - তা সে শারীরিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং/অথবা আধ্যাত্মিক হোক না কেন।
যখনই তোমার উপরে কোন কষ্ট চাপানো হয় - উদাহরণস্বরূপ, শারীরিক ব্যাথা - তার দিকে তাকাও এবং ব্যাথার সেই ধারণাকে তোমার মধ্যে শিকড় গাড়তে দিও না। তোমার সমস্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কার্য্য - সবই শুরু হয় যখন তুমি স্বীকার করে নাও যে জীবন একটি বেদনা।
এটা সত্য নয়! তোমাকে জীবনে কিছুই করতে হবে না যদি তুমি জীবনমুক্তি বা স্বাস্থ্য বা কটি টাকা চাও। তোমার আকাঙ্ক্ষা করা সমস্ত
মঙ্গলজনক জিনিষ এবং তোমার ভাবা জীবনে প্রয়োজনীয় মঙ্গলকর জিনিষগুলি তোমাকে প্রদান করা হবে।
আমি সততার সাথে বলি, যেদিন আমি নির্য়্য নিলাম আমি দুঃখ করব না, সবকিছু আমার চারপাশে জড় হতে থাকল। উত্তম শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য বা ধনসম্পত্তি বা আনন্দ বা আবেগজনিত স্বাস্থ্য বা বাস করার জন্য সুন্দর পরিবেশ - সবকিছু আমার চারপাশে জড় হতে লাগল।
যদি কোন কয়লাখনিতে গিয়ে ফিরে আস স্বভাবতই তোমার দেহে কালো ধুলা জমা হবে।
একইভাবে কেবল এই একটি সত্যকে নিয়ে নির্য়্য নাও - আমি দুঃখ পাব না। জীবনমুক্তি তোমার মধ্যে ধুলার মত লেগে যাবে। আমি তোমাদের বলি, যে ব্যক্তি নির্য়্য নিয়েছে ‘আমি দুঃখ পাব না’, তার কাছে জীবনমুক্তি ধুলিকণা থেকে বড় কিছু নয়।
লোকেরা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘স্বামীজী, কিভাবে দুঃখকষ্ট শেষ করব? যুক্তিপতভাবে আমি বুঝতে অসমর্থ। এরকম পরিস্থিতিতে আমি কিভাবে আনন্দপূর্ণ হব?’
আমি তাদের বলি, ‘আরে বাবা! যখন ভুল যুক্তি প্রয়োগ করে তুমি এত দুঃখকষ্ট পাও, তাহলে ভুল যুক্তি ব্যবহার করে আনন্দ কেন করতে পার না?’
অনেক সময়ে তোমার দুঃখকষ্টের কোন অবলম্বন নেই। কিন্তু তুমি কষ্ট পেতেই থাক। অনেক সময় তুমি বোঝ যে যুক্তিগতভাবে সেটা ভুল। কিন্তু তুমি এক প্যাটার্ন তৈরি কর যে যুক্তিগতভাবে ভুল হলেও তুমি কষ্ট পেতে থাকবে এবং যুক্তিপত দিক থেকে সঠিক হলেও তুমি উপভোগ করতে চাও না। তুমি আনন্দে থাকতেই চাও না।
বোঝ, যদিও সেটা ভুল যুক্তি থেকে আসে, যদিও তুমি সেটাকে কেবল
Page 37
যুক্তিসম্মতভাবে ব্যাখ্যা কর, যদি তুমি এই বোধটিকে আঁকড়ে থাক, ‘ঠিক আছে, আমি আর দুঃখকষ্ট পাব না’, তাহলে তুমি সহজেই সঠিক যুক্তিতে চলে আসবে। ভুল যুক্তি সহকারে তুমি দুঃখকষ্টকে বেশী সময় ধরে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। কিছু বছর পরে কোন একটা সময়ে তুমি সঠিক যুক্তিতে চলে আসবে।
কোন কিছুই জন্য দুঃখ করো না। একদম স্পষ্টভাবে ঘোষণা কর - দুঃখ নয়! ভীষণ গৌড়া হয়ে নির্নয় নাও : দুঃখ নয়!
আমি তোমাদের বলি, তোমার স্বাস্থ্যের একটা মুহূর্তেও দুঃখ করার কোন মূল্য নেই। দুঃখকষ্ট খুবই ছোট ব্যাপার। প্রতিটি মুহূর্তে তোমার বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা দুঃখকষ্ট, যা নাকি এক অতি সাধারণ ব্যাপার, তার চেয়ে অনেক অনেক মূল্যবান।
প্রক্রিয়া
দুঃখকষ্টকে না বল
দুঃখকষ্টহীনতার আকাশকে অভিজ্ঞতা করার জন্য নীচে একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী ধ্যান দেওয়া হল।
নির্দেশাবলী
কয়েক মিনিট এই একটি সত্য সহকারে বসো : ‘আমি দুঃখ করব না’
সচেতনভাবে নির্নয় নাও, ‘আমি আমার পতিকে অত্যাচার করতে দেবো না ও দুঃখ পাব না। আমি আমার পত্নীকে অত্যাচার করতে দেবো না ও দুঃখ পাব না। কেউকিছুই আমাকে দুঃখ দিতে পারবে না। দুঃখকষ্টহীনতা হল আমার ধর্ম।’
এটাকে এক ধর্মীয় নির্নয় হিসাবে গ্রহণ কর।
৩) মূল দুঃখকষ্টের গভীরে যাও
তোমার মূল দুঃখকষ্টকে বুঝতে পারলে জীবনে সমস্ত কষ্ট থেকে তুমি বিরাট পরিত্রাণ পাবে - কারণ তুমি জানতে পারবে তোমার পাওয়া প্রতিটি দুঃখকষ্টই এক এবং একই কষ্ট বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। আর সেটা তোমার ভাব অনুযায়ী দুঃখকষ্ট নয়।
শ্রবণ কর : কারণ তোমার অস্তিত্ব তো এক কষ্টভোগ, কারণ মহাজাগতিক অস্তিত্ব হল কষ্টভোগ এবং মহাজগৎ তার অস্তিত্বকে তোমার অস্তিত্বের মাধ্যমে প্রকাশ করতে সংগ্রাম করছে। সেটা যেন এক শিশুর মাতৃজঠর থেকে বাইরে আসার চেষ্টা। তোমার ভিতর থেকে জীবনমুক্তি প্রকাশিত হবার চেষ্টা করছে। তোমার সামগ্রিক অস্তিত্বে বেদনা কারণহীন - যেন প্রসবকালে এক শিশী তার বেদনার কারণ কনিষ্ঠ আঙুলে বা মাথায় বা পায়ে আছে বলে শনাক্ত করছে। তার সেই বেদনার জন্য সে যাই কারণ নির্নয় করুক না কেন, তা তো ভুলই হবে, বিভ্রান্তিকর হবে।
Page 38
একইভাবে তোমার যত্নের জন্য, তোমার দুঃখকষ্টের জন্য যে কারণই খুঁজে বার কর না কেন, তা হবে বিভ্রান্তিকর। কারণ শিশু যেভাবে নিজেকে প্রসব করার চেষ্টা করে, যেভাবে মায়ের থেকে বাইরে আসার চেষ্টা করে, একইভাবে মহাজগৎ নিজেকে তোমার থেকে প্রসবিত হবার চেষ্টা করছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সেটা ঘটতে না দাও, তুমি যত্ননা বহন করতে থাকবে। সেই কষ্ট তো থেকেই যাবে।
আঁধার রাত (ডক নাইট অফ দা সোল)
কিছু খ্রীস্টান সন্তের জীবনে মূল দুঃখকষ্টকে 'আঁধার রাত' (dark night of the soul) আখ্যা দিয়ে খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করা আছে। যতক্ষণ তুমি এক এনগ্রাম (সংস্কার) ভিত্তিক সমস্যা নিয়ে কষ্ট পাও, তুমি মূল সমস্যাকে ধরতে বা অভিজ্ঞতা করতে পার না। প্রথম ধাপ হল সঠিক সমস্যাকে খুঁজে বার করা। প্রকৃত সমস্যাকে বুঝতে পারাকেই খ্রীস্টান ধর্মতত্ত্বে আঁধার রাত বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
কিছু মানুষ আছে, যদি তারা বিষণ্ণ হয়, আমি তাদের কোনও যত্ন করি না, কারণ সেগুলি প্রকৃত সমস্যা নয়। সেগুলি এনগ্রাম ভিত্তিক সমস্যা। সেটা তাদের এক মানসিক স্বভাব। যদি আমি তাতে মনোযোগ দিই, তারা আরও একটি এনগ্রাম তৈরি করতে শুরু করবে, 'ওঃ! যদি আমি কষ্ট পাই, তারমানে আমাকে আরও মনোযোগ দেওয়া হবে' সেটা তো আরও একটা এনগ্রাম হয়ে যাবে। তাই আমি খেয়ালই করি না। কিন্তু আরও কিছু মানুষ আছে যাদের একটু বিষণ্ণতা হলেও আমি তাদের সরাসরি তাদের যত্ন নেব, কারণ সেই বিষণ্ণতা প্রকৃত কারণ থেকে হয়েছে।
যতক্ষণ তুমি তোমার দুঃখকষ্টকে কোন কারণের সাথে সংযুক্ত কর, তুমি বিপথে আছ। তুমি ভুল দিকে যাচ্ছ। তুমি সঠিকভাবে নিজের রোগ নির্ণয় কর নি। যখন তুমি বুঝবে যে দুঃখকষ্টের কোন কারণ নেই, দুঃখকষ্ট দূর হয়ে যাবে।
আমি এক আত্মাকে আত্মা বলব কেবল যখন সে স্বতন্ত্র ও জাগ্রত শক্তি হয়েছে। এখন, এইরূপ ব্যক্তির জীবনে কোন ঘটনা ঘটলে সে ঘটনাটি থেকে শুধুমাত্র শিক্ষা গ্রহণ করে। ভুল অবগতি ও ভুল কার্য না করে যখন তোমার অভিজ্ঞতা বাস্তব হয়ে যায়, যখন তোমার আবেগ বাস্তব হয়ে যায়, তখন তুমি অভিজ্ঞতা কর প্রত্যাগত জাগ্রত চৈতন্য - জীবাত্মার জাগরণ।
এমনকি নিজেকে দোষ দেওয়াও এক ভুল অবগতি। যখন তুমি তোমার দুঃখকষ্টের জন্য কোন নির্দিষ্ট কারণে অভিজ্ঞতা করা বা বোধ কর, তার অর্থ অন্তর্জাগরণ ঘটেছে। আঁধার পরিপক্কতা ঘটে আরম্ভ হয়েছে। আঁধার রাত্রি আরম্ভ হয়েছে। আঁধার রাত্রিকে যেন ভুলভাবে বোঝা না হয়। দয়া করে বোঝ, তোমার সমগ্র সত্তা ভীষণ বিষণ্ণতা দ্বারা ভরে যাচ্ছে, কিন্তু সেটাকে ভুল অর্থে নেওয়া উচিত নয়। তোমার অস্তিত্বের মাধ্যমে মহাজগৎ নিজের অস্তিত্বকে প্রকাশ করার চেষ্টা করছে।
এটা প্রসব বেদনার মত। প্রসব বেদনাকে এক অমঙ্গল অভিজ্ঞতা ভাবা উচিত নয়। পৃথীগ্রহে নতুন এক জীবনকে নিয়ে আসার জন্য এটা এক মঙ্গলময় অভিজ্ঞতা। একইভাবে আঁধার রাত্রি আরও এক মঙ্গলময় অভিজ্ঞতা। জীবনমুক্ত মানুষকে পৃথীগ্রহে নিয়ে আসার এক মঙ্গলময় প্রকাশ। আমি বলতে পারি, যেদিন আঁধার রাত্রি অভিজ্ঞতা কর, আঁধার পরিপক্কতা শুরু হয়।
তাই তোমার দুঃখকষ্টের ভুল অবগতি কোরো না। তোমার পরিবার তোমার দুঃখের জন্য দায়ী নয়। তোমার বন্ধুরা তোমার কষ্টের জন্য দায়ী নয়। তোমার শত্রুরা তোমার কষ্টের জন্য দায়ী নয়। এমনকি মানবসমাজও তোমার দুঃখকষ্টের জন্য দায়ী নয়। তুমি কষ্ট পাচ্ছ, ব্যস! জীবনমুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত তোমার অস্তিত্বই হল দুঃখকষ্ট।
Page 39
- সঠিক অবগতি কর
শ্রবণ কর : তোমার প্রকৃতি হল সৎ-চিৎ-আনন্দ - অস্তিত্ব-চেতনা-আনন্দ। অস্তিত্ব, চেতনা ও আনন্দ কখনও আলাদা হয় না। তোমার দুঃখকষ্টের মুহূর্তগুলিতে তুমি বিদ্যমান থাক না। তোমার জীবন ব্ল্যাক-আউট (আলোকহীন) হয়ে যায়। সেই সময়ে তুমি ব্ল্যাক-আউটের মধ্য দিয়ে যাও।
দয়া করে বোঝ, যদি সঠিক জীবনী আমরা লিখি, যে বইতে তোমার সমস্ত কার্য নথিভুক্ত থাকবে, তাহলে সেই বইতে অনেক খালি পাতা থাকবে। অনেকগুলি পাতায় কিছুই লেখা থাকবে না। সেই শূন্য মুহূর্তগুলিতে তুমি কোন কিছুই জন্ দুঃখ করছিলে।
তোমার জীবন কাহিনী অনবরত লেখা হচ্ছে। তোমার জীবনকালে তা রেকর্ড হয়ে যায়। তোমার আনন্দের সমস্ত মুহূর্তগুলি তোমার জীবনীতে স্থান পায়। যদি তুমি দুঃখ করছ, তাহলে দয়া করে স্পষ্ট হয়ে যাও, আরও বেশী খালি পাতা থাকবে।
আনন্দ ও প্রসন্নতা তোমার জীবনে স্পন্দন নিয়ে আসে। আমি তোমাদের বলি : দুঃখকষ্ট না পাওয়া হল চরম আধ্যাত্মিক অভ্যাস। তখন তুমি এমন এক স্তরে উন্নীত হয়ে যাও যেখানে তুমি জীবনমুক্তি সম্পর্কে পরোয়া কর না; সেটা শুধু একটা পার্থ-প্রতিক্রিয়া, যেন তোমার হাঁটার সময় ধুলো ওঠা। যেভাবে হাঁটার সময় তোমার পায়ে ধুলো জমে, সেভাবে জীবনমুক্তি তোমার পায়ে জড়ো হবে।
আমি তোমাদের বলি, জীবনমুক্তি লাভ করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হল সেটাকে তোমার চরণে অর্পণ করা, খুব সময় ধরে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নয়, যেন তা তোমার পাত্রে ভরে দেওয়া হবে। না! যদি সেটা তোমার পাত্রে দেওয়া হয়, তা তো যে কোন সময়ে নিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তুমি সেটা হারাতে পারো। যদি তুমি দুঃখকষ্টহীনতার এই অভ্যাসটি ধরে রাখ, জীবনমুক্তিও তোমার চরণধুলো হয়ে যাবে।
Page 40
দুঃখকষ্ট থেকে মুক্ত হওয়া :
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
যখন আমার জীবনমুক্তির চরম অভিজ্ঞতা পাই এবং এই দেহে স্থির হই, তখন সবকিছু নিরর্থক লাগল। সত্যি। আমার করা সমস্ত সাধনা : পূজা, অর্চনা, ধ্যান, ভগবানের নাম বারবার বলা, মন্দিরে যাওয়া - সবকিছু নিরর্থক লাগল।
যখন আমার আধ্যাত্মিক অভ্যাসগুলি করেছিলাম, আমি আক্ষরিক অর্থে আধ্যাত্মিক অভ্যাসগুলির জন্য অতিশয় গৌড়া ছিলাম। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরেই প্রথম যে জিনিষটা আমি করব তা হল অরুণাচল পাহাড়কে তাকিয়ে দেখা। সেটা আমার মধ্যে এক ধর্মান্ধতার মত ছিল। বোধ, যে পরিসরে জীবনমুক্তি ঘটে এবং যে পরিসরে আধ্যাত্মিক অভ্যাসগুলি করা হয়, তারা আলাদা। তাদের মধ্যে কোন সংযোগ নেই।
আমি হঠাৎ অনুভব করলাম, ‘হে ভগবান, এগুলো আমার পরের প্রজন্মকে শেখানো উচিত নয়। পুরো জিনিষটাই নিরর্থক।’
একটা ছোট গল্প :
এক জঙ্গলে অনেক ব্যাঙ একসাথে বাস করত। তারা ঠিক করল যে অন্য কোন দেশে পাড়ি দেবে। তারা বুঝল অন্য দেশে যাবার একমাত্র উপায় হল উড়ে যাওয়া। তারা সবাই মিলে পরিকল্পনা করতে লাগল কিভাবে ফ্লাইট ধরা যায়। লাল দাড়িওয়ালা এক বুদ্ধিমান ব্যাঙ বলে, ‘ওহে, আমাদের জঙ্গলের ওপর দিয়ে রোজ সকালে উড়ে যাওয়া ফ্লাইট নিশ্চয় দেখেছ। কাল আমরা সবাই মিলে প্লেনটাকে থামাব, তাতে
চড়ব ও বিদেশ যাব।’ পরের দিন তারা ফ্লাইট থামাবার চেষ্টা করে। তারা সবাই একত্র হল, আর খুব চিৎকার করল। কিন্তু পাইলট শুনল না। পরের দিন তারা একটা বড় লাউডস্পীকার নিয়ে এসে গ্লেনের দিকে চিৎকার করতে থাকল, ‘ওহে, আমরা সবাই এখানে। আমরা সবাই তোমার সওয়ারী হতে চাই। আমাদের অন্য দেশে নিয়ে চল।’ পাইলট থামে না। পরদিন তারা ঠিক করল, ‘আমরা ধর্মঘট করব। আমরা আকাশে ফ্লাইটটিকে থামাব।’
তাই তারা সবাই একত্র হল এবং যত পারে কাঠি, সুতা এসব যোগাড় করে সেগুলিকে একসাথে নিয়ে বিরাট একটা সীড়ি তৈরি করতে গেল। এত প্রচেষ্টার জন্য পুরো দেশ আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকল। সবাই তাদের সাধ্যমত বড় বড় কাঠি ও সুতা নিয়ে আসার চেষ্টা করল। এই সীড়ি বানাবার জন্য কিছু ব্যাঙ বিয়াম করে দেহগঠনও করতে লাগল। দশ বছর কঠিন পরিশ্রমের পর তারা একটা বিশাল সীড়ি বানাল, যেটা কেবল সাত ফুট উঁচু। কিন্তু প্লেন তো চল্লিশ হাজার ফুট ওপর দিয়ে যাচ্ছে! এই ব্যাঙরা কি কখনও এমন এক সিড়ি বানিয়ে ধর্মঘট করতে পারবে, আর প্লেন থামাতে পারবে? না! তাদের প্লেন থামাবার ও পাইলটের মনোযোগ পাবার চেষ্টা তো বৃথা।
কোন একটা সময়ে - কারণ তোমার জানা নেই - হঠাৎ পাইলট সেই জঙ্গলে প্লেনটাকে নামানো ঠিক করে। যদিও সে চায়, সে মাটিতে পুরোপুরি নামতে পারে না। সে কিছু একটা উচ্চতায় প্লেনটাকে নামিয়ে আনতে পারে এবং শেখান থেকে একটা দড়ি ঝুলিয়ে ব্যাঙগুলিকে এক এক করে উঠে আসতে বলতে পারে। পাইলট সবচেয়ে বেশী সেটাই করতে পারে। সেটাই ঘটে যখন তিনি প্রায় নেমে আসেন ও দড়ি খোলান। তিনি তখন ব্যাঙদের এক এক করে উঠে ভিতরে আসতে বলেন।
সেই দড়িটাকে বলে অবতার।
Page 41
আমি তোমাদের বলি : অন্য কোন পথ নেই। তোমার সমস্ত প্রচেষ্টা বৃথা। যখন রামকৃষ্ণ মঠে ছিলাম, সমস্ত কাজ শেষ করার জন্য আমি রাত বারোটা পর্যন্ত জেগে থাকতাম। চার পাঁচটা ক্ষেত্রে আমার দায়িত্ব ছিল : প্রকাশন, রান্নাঘর ইত্যাদি।
রাত বারোটায় আমি ঘরে ফিরতাম। তারপর ম্যান কররে বসতাম এবং পূজা ও ধ্যান করতাম। আমি দুই আড়াই ঘন্টা বসতাম। ততক্ষণে ভোর তিনটা - পরদিনের আধ্যাত্মিক অভ্যাসের জন্য তখন সময় হয়ে গেছে! প্রায় দুই বছর আমি এইভাবে কাটালাম। বাস্তবিকভাবে আমার কোন ঘুম ছিল না। অবশ্যই এটা সবর বিশ্বাস করতে অসুবিধা হবে।
আমার যখন জীবনমুক্তির চরম অভিজ্ঞতা হল, আমি অনুভব করলাম, 'হে ভগবান, এগুলো সবই বৃথা!' এটা তো সেই ব্যাঙদের গল্পে চড়ার জন্য লেন থামাতে ধর্মঘট করার জন্য উঁচু সিঁড়ি বানাবার গল্পের মত। প্রকৃতপক্ষে আমার জীবনমুক্তির পরে দেহে সুস্থির হয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়া হল, 'হে ভগবান, সমগ্র বিশ্ব ভুল পথে চলছে!'
যে লক্ষ্য তোমাকে অভিজ্ঞতা করতে হবে তা হল অব্যক্ত, অচিন্ত্য ও অবিকার অর্থাৎ অপ্রতীয়মান, অকল্পনীয় ও অপরিবর্তনীয়। বেদসমূহ সুন্দরভাবে বর্ণনা করে, যাকে তুমি মহাজগৎ বলে জান, সেই তথাকথিত মহাজগৎ প্রকৃত মহাজগতের এক চতুর্থাংশও নয়। সত্তর শতাংশের বেসী হল অপ্রতীয়মান। তার অর্থ কি? যা কিছু প্রতীয়মান হয়েছে তা দ্বারা তুমি মহাজগৎকে বুঝতে পার না। তুমি তাকে তোমার চোখ, কান, জিহ্বা ও দেহ দিয়ে অনুভব করতে পার না। তুমি তো তাকে উপলদ্ধি করতে পার না।
তাই পরম অপ্রতীয়মানকে অভিজ্ঞতা করার জন্য প্রতীয়মান জগৎ যা কিছু কর তা বৃথা। আমি তোমাদের সবারই লাইসেন্স দিতে চাই না কিন্তু আমাকে ব্যাপারটাকে স্পষ্ট করতেই হবে।
আবার তোমার কোন ভুল কার্য তোমার জীবনমুক্তিতে বাধা দিতে পারে না। এমন নয় যে যখন পাইলট ধীরে ধীরে নীচে আসে এবং ব্যাঙদের ওপর আসার জন্য দড়ি ঝুলিয়ে বলে, 'প্রে ব্যাঙটা মাতাল, তাই প্লেনে চড়বো না। ঐ ব্যাঙটা ঠ্যাং, ওকে চড়াবো না। যখন সবাই সাত ফুট সিঁড়ি বানাবার কাজ করছিল, ও তো মহাসুখে ঘুমাচ্ছিলো!'
না! এগুলো একটিও দেখা হবে না। জীবনমুক্তি এক পূরোপুরি ভিন্ন পরিসর।
Page 42
দুঃখকষ্ট সম্পর্কে অন্তিম কথা
পরমপুরুষ পরমহংস নিত্যানন্দ দ্বারা
জন্ম সম্বন্ধে আকাশিক লেখন পাঠ থেকে কিছু অংশ
তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১২
এটা হল জন্ম সম্বন্ধে আকাশিক রেকর্ড থেকে পাঠ।
জন্ম বলে কিছুর অস্তিত্ব নেই। মহাসাগরে প্রতিটি জলবিন্দু যখন তার সহজাত বৃদ্ধি দ্বারা চলে, সে প্রত্যক্ষ করে যে তার জন্ম হয়েছে ও পূর্ণ থেকে আলাদা হয়েছে। যখন সে আত্মার মূল থেকে মুক্ত হয়, তাকে জীবনমুক্তি বলে।
উৎস থেকে বিযুক্ত হওয়া - মানুষের এই অনুধাবন অনুযায়ী জন্ম ঘটছে না। উৎস অংশের অংশ হয়েই থাকে, যদিও অংশটি মনে করে সেটি ইতিমধ্যে উৎস থেকে আলাদা হয়েছে।
উৎস তার সর্বব্যাপী ও সকল-বৈজ্ঞে উপস্থিতি দ্বারা প্রতিটি কার্যে, প্রতিটি ক্রিয়াতে প্রতি পদক্ষেপে, প্রতি ব্যবহারে, প্রতিটি মুহূর্তে অংশের সাথে সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ করে। এই অংশগ্রহণ কখনও অংশকে পূর্ণ থেকে আলাদা হতে দেয় না। তাই অংশ সর্বদা পূর্ণের অংশ হয়েই থাকে।
তুমি যেভাবে বোঝ, মহাজগতে সেইভাবে জন্মের অস্তিত্ব নেই। অবিরত তোমার চলাফেরা, তোমার বাসনা তোমার মধ্যে চেতনার বিভিন্ন অবস্থা সৃষ্টি করে। চেতনার এই পরিবর্তিত অবস্থাগুলি যথা কামনা, ক্রোধ, লোভ, ভয়, ঈর্ষা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভালবাসা, ঋদ্ধিত্বভার, বিষাদ, এইসব বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও প্রকাশের কারণে অংশ অনুভব করতে শুরু করে যে সে পূর্ণ থেকে পৃথক হয়েছে। যেই মুহূর্তে অংশ পূর্ণ থেকে আলাদা হওয়া অনুভব করে, সে দাবী করে সে জন্ম নিয়েছে।
তাই তোমার ভাবা মত জন্ম প্রকৃতপক্ষে ঘটে না। যখন একটা দেহ অন্য দেহ থেকে বার হয়ে আসে, তাকে জন্ম বলা যায় না। কেবল যখন ব্যাক্তিগত সজাগতা নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অনুভব করে, জন্ম আরম্ভ হয়। জন্ম হল দুঃখকষ্টের শুরু, কারণ অংশ তার অতীতের উৎস এবং উৎসের সাথে সংযুক্তি ও অংশগ্রহণ ভুলে যায়।
অংশ যেহুতু সম্ভক্ততার উৎস ভুলে যায়, জন্ম মুহূর্ত থেকেই বিভ্রান্তিকর দুঃখকষ্ট অংশের জীবনশৈলী হয়ে যায়। একটা শরীর, যাকে মাতা বলা হয়, তার থেকে তোমার শরীরের আলাদা হওয়াকে জন্ম বলা যায় না, যেহুতু সেই স্বতন্ত্র অংশটিতে অবিলম্বে দুঃখকষ্ট চাপানো হয় না, কারন স্বতন্ত্র অংশটি তখন নিজেকে স্বতন্ত্র অংশ বলে ধারণা করার দাবী করে না, অনুভব করে না, ক্ষণতাকে রাখে না ও অংশগ্রহণ করে না।
তাই সত্য একইভাবে থাকে, যদিও একটা শরীর আলাদা হয়েছে।
Page 43
আরেকটা শরীর থেকে যাকে তুমি মা বল।
যেই মূর্তিতে ব্যক্তিগত চেতনা অনুভব করে যে অংশটি আর সরাসরি পূর্ণের সাথে অংশগ্রহণ করছে না, সেই মূর্তিটিকে জন্ম বলে গণ্য করা যায়। সেই মূর্তিটিতে দুঃখের প্রেরণা নির্দেশ করে। তা (দুঃখকষ্ট) প্রেরণিত হতে থাকবে যতক্ষণ সেই ব্যক্তি অর্থাৎ সেই অংশ মনে করে পূর্ণের অস্তিত্ব থেকে তার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে।
অংশ যখন অংশ হয়ে থাকে, তা চেতনার বিভিন্ন অবস্থার সৃষ্টি করতে থাকে এবং চেতনার এই নানা অবস্থাগুলো সেই স্বতন্ত্র অংশের জন্য এই বিশ্বের ক্যালাইডোস্কোপিক (kaleidoscopic) বা বিচিত্র চলচ্ছবির অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে।
যখন স্বতন্ত্র অংশটি পূর্ণ থেকে আলাদা হবার জন্য তার ভুল বুঝতে পারে, সে পূর্ণে রিল্যাক্স করে; সেই মূর্তিটিকে বলা হয় জীবনমুক্তি।
Page 44
পরমপূজ্য পরমহংস নিত্যানন্দ সম্পর্কে
পরমপূজ্য পরমহংস নিত্যানন্দ আজ সনাতন হিন্দুধর্মের এক সুস্পষ্ট, রাষ্ট্রসিক্ত, রাজনৈতিক উদাসীন প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি অতিচেতনার জীবন্ত অবতার বলে পূজিত। হিন্দুদের সবচেয়ে প্রাচীন শীর্ষস্থানীয় আখড়া মহানির্ৰাণী পীঠের তিনি এক মহামণ্ডলেশ্বর ইউটিউবে (youtube.com) সর্বাধিক জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক শিক্ষক হিসাবে তাঁর বিভিন্ন ভাষণ কয়েক কোটিবার দেখা হয়েছে। তিনি ২০টির বেশী ভাষায় প্রকাশিত ৩০০টির বেশী গ্রন্থের রচয়িতা। তাঁর ভাষণ প্রতিদিন লাইভ দেখা যায় http://nithyananda.tv তে, বহু আন্তর্জাত্রিক চ্যানেলে এবং ভিডিও কনফারেন্সিং করে।
চেতনা ও কৃপালিনী জাগরণের ক্ষেত্রে পরমহংস নিত্যানন্দকে আজ বিশ্বের বিশিষ্টতম বিশেষজ্ঞ বলে গণ্য করা হয়। যোগ বিজ্ঞানসমূহ যথা, ত্রিনয়ন জাগরণ, আধ্যাত্মিক নিরাময়, উখান (লেভিটেশন), টেলিপোর্টেশন, টেলেস্টারভিজন, রাব্বি ভবিষ্যতবাণী এবং খালি প্রয়োজনীয়তার উর্ধ্বে যাওয়া - এগুলিকে তিনি সফলভাবে রহস্যময়ক করেছেন।
তিনি এক আধ্যাত্মিক প্রতিভা এবং ম্যানেজমেন্ট থেকে মেডিটেশন (ধ্যান), রিলেশনশিপ থেকে রিলিজিয়ান এবং সফলতা থেকে আধ্যাত্মিকতাতে তাঁর প্রবুদ্ধ অন্তর্দৃষ্টি আছে এবং তিনি আমাদের জন্য সম্পদ হিসাবে নিয়েছেন এসেছেন ব্যবহারিক প্রজ্ঞতা, ধ্যান-প্রক্রিয়া এবং অন্তরের স্থায়ী রূপান্তরের জন্য পদ্বতিসমূহ।
Page 45
পরমহংস নিত্যানন্দ বিশ্বজুড়ে কতিপয় অলাভজনক সংস্থার আধ্যাত্মিক অধিকর্তা। এই সংস্থাগুলি ব্যক্তিগত রূপান্তরের প্রোগ্রাম ও কোর্স, প্রকাশন, বৈদিক বিজ্ঞান ও জ্ঞানের প্রসারণ, আধ্যাত্মিক নিরাময় এবং লোকহিতকর সেবার মাধ্যমে বহু জীবনকে সমৃদ্ধ করে।
ব্যক্তির রূপান্তরের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি উন্নীত করার জন্য বিশ্বমানবহিতৈষী পরমহংস নিত্যানন্দ দিবারাত্র কাজ করছেন। তাঁর আধ্যাত্মিক মিশনে পৃথিবীব্যাপী বহু আশ্রম ও কেন্দ্র আছে। সেগুলি আধ্যাত্মিক গবেষণাগার, সেখানে অন্তরের প্রগাঢ় বিকাশ ঘটে এবং বহির্বিকাশ এক স্বাভাবিক ফল।
সেবাকার্যগুলির মধ্যে আছে ধ্যান ও নেশামুক্তির ক্যাম্প, দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির ও কৃত্রিম অঙ্গ দান, শিক্ষা সহায়তা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, গ্রামাঞ্চলে শিশুদের সহায়তা, কারাবাসীদের জন্য ধ্যানশিবির এবং দরিদ্র্যে ব্রাণকার্য।
পরমহংস নিত্যানন্দ ভারতীয় সংস্কৃতি ও প্রাচীন বৈদিক প্রথা সম্বন্ধে আন্তর্জাতিক সজাগতা সৃষ্টি করার জন্যও গভীরভাবে সমর্পিত। অতীন্দ্রিয় জীবনমুক্ত, আধ্যাত্মিক বিবর্তনবাদী, প্রশিক্ষিত যোগী, শক্তিশালী হিলার এবং সিদ্ধপুরুষ পরমহংস নিত্যানন্দ বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের জন্য এক অনুপ্রেরণা। তাঁর শ্রদ্ধা, অভিজ্ঞতার গভীরতা এবং আধ্যাত্মিকতাকে ব্যাখ্যাতিক ও উপাখ্যানমূলক ভঙ্গিতে বর্ণিয়ে কেলনার বিরল প্রতিভার জন্য তাঁর শিক্ষা দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়েছে।
পরমহংস নিত্যানন্দ হাজার হাজার মানুষের নানাবিধ রোগ নিরাময় করেছেন - প্রায়ই কেবল তাঁর একটি ছোঁয়াতেই! প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী কোটির বেশী মানুষের সাথে কার্য ও শেয়ার করতে করতে পরমহংস নিত্যানন্দ ও তাঁর মিশন মানবজাতির পরবর্তী বিরাট সাফল্য, ‘অতিচেতনা’-তে নিয়ে যাবার জন্য সনাতনয করতে বন্ধপরিকর।
আমাদের ওয়েবসাইট সমূহ
নিত্যানন্দ মিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট http://nithyananda.org/
পরমহংস নিত্যানন্দের লাইভ সৎসঙ্গ রোজ দেখা যায় http://nithyananda.tv/
আমাদের প্রধান ধ্যান প্রোগ্রাম ‘ইনার অ্যাওয়েকেনিং’ (অন্তর্জাগরণ) সম্বন্ধে আরও জানুন http://innerawakening.org/
বিনামূল্যে চার হাজারের বেশী ভিডিও দেখুন www.youtube.com/lifeblissfoundation
নিত্য যোগ বিজ্ঞান আবিষ্কার করুন http://nithyayoga.org/
অনলাইনে নিত্যানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসুন http://nithyanandauniversity.org/
সচেতন গর্ভধারণ ও বেদনাহীন প্রসবের বৈদিক বিজ্ঞান আবিষ্কার করুন http://enpregnancycare.nithyananda.org/
Page 46
শারীরিক ও মানসিক রোগের যৌগিক সমাধান http://nithyananda.org/nithya-kriyas
বিনামূল্যে তিনশ’ ষাট ধ্যান পদ্ধতি http://meditationisforyou.org/
আধ্যাত্মিক সমাধান ও প্রভূত দ্বারা জীবন সমৃদ্ধকরণ www.nithyanandagalleria.com
বিশ্বশান্তি ও আনন্দের জন্য ধ্যান করুন www.minute4peace.org/addminutes.jsp
86
Page 47
11 Years of NITHYANANDA MISSION 2003-2014
Over 300 books of Paramahamsa Nithyananda's teachings published in 20 languages
Over 2000 free talks by Nithyananda on www.YouTube.com/lifeblissfoundation crossing 18 million views
Over 250 e-books and 600 meditation techniques and solutions available free online
Nithyananda University offering courses in meditation, spiritual sciences and life skills being established across the world
Breakthrough research on mystical yogic sciences like kundalini awakening, levitation, teleportation and yogic age-reversal
The Nithyananda Order - Hundreds of aspirants from various religions and walks of life receiving intensive spiritual training and sannyas
Ananda Yogam - free one-year residential program for youth aged 18-35 years, offering vocational and spiritual training for excellence and personal growth
A dynamic volunteer force, including over 1000 full-time resident volunteers, offering services such as disaster relief, counseling, initiatives for youth and women's empowerment
Nithya Kriyas and Sannyamas - 108 authentic yogic solutions for physical and mental ailments
Holistic-lifestyle aids including devotional music, energized jewelry, sacred arts and sculpture, and natural siddha medicines
11 Years of NITHYANANDA MISSION 2003-2014
Yoga, meditation and spiritual counseling centers and camps touching over 15 million people in 150 countries
Over 9000 ordained spiritual healers healing 20,000 people globally every day
Over 1000 ordained teachers guiding thousands in yoga, meditation, spiritual sciences and life solutions
Live online morning satsang by Paramahamsa Nithyananda via live streaming and video conferencing, viewed in thousands of places in over 40 countries every day
Annadaan - 10,000 free meals distributed every day at ashrams, schools, medical camps and to the needy
Weekly medical camps offering conventional and alternative medical care, oral health, eye surgeries, prosthetics, etc. - including free consultation, medicines and follow-up.
Over a dozen Vedic temples and ashrams worldwide housing 3720 energized deities, including some of the tallest deities in the world.
Free kriya & meditation programs in prisons and schools
Nithyananda Lakshmi, a non-profit micro-financing scheme for rural entrepreneurs
Nithyananda Grama Seva Yojana (NGSY) empowering over 300 villages in Karnataka by creating opportunities for their socio-economic development.
Nithyananda Vidyalayas - Schools blending modern education with the Vedic system of learning
Support for schools in rural areas, including school uniforms, books, stationery and infrastructure
nithyananda.org nithynanda.tv
nithyananda.org nithynanda.tv
Page 48
TAKING
Vedic Hindu Tradition
INTO HOMES ACROSS THE WORLD
INSPIRING A GLOBAL
Vedic Renaissance
Protecting, preserving and promoting Vedic Hindu tradition through
Vedic Temples in India, USA, Canada, Malaysia and other countries
Inspiring families to live the Vedic tradition through over 400 Paduka
Mandirs housing 3720 energized deities where daily worship is
performed in the authentic Vedic tradition
Thousands of people worldwide
simultaneously perform Vedic
rituals during the daily morning
satsang, creating powerful
positive vibrations
Reviving India's pilgrimage
culture by regularly leading
yatras to spiritual energy fields
like Kailash-Manasarovar,
Char-Dhaam, Varanasi,
Bodh Gaya, Angkor Wat,
Kumbh Mela, etc.
Nithyananda Sacred Arts to promote, support and preserve
ancient temple arts and sculpture as the largest producer
of metal, wood and stone deities in India
Daily morning live satsang by Paramahamsa Nithyananda
viewed online in over 40 countries through two-way video
conferencing and Nithyananda TV.
Daily spiritual talks by Paramahamsa Nithyananda viewed
on various TV channels
Over 20 different types of meditation programs at various
levels offered in corporates, schools, prisons, etc.
Nithya Yoga & Nithya Kriya - authentic yogic solutions for
108 physical & mental disorders
Scientific & safe initiation into mystical yogic sciences like
kundalini awakening, levitation, hunger-free Samyama etc.
The Nithyananda Sannyas Order for spreading and continuing
the sannyas parampara (tradition)
Nithyananda Gurukuls and eN-Vidyalayas offering holistic
traditional and modern education in a healthy environment
Inspiring the youth to be the ambassadors of Vedic tradition
by enriching them through scripture study, rituals and kriyas
Page 49
Reaching Out to Serve the World
Kalpataru Kshetra - Bidadi
ANNADAAN : FREE FOOD FOR ALL
More than 10,000 free meals served each day in Nithyananda ashrams and centers worldwide.
Nutritious vegetarian meals cooked using authentic sattvic methods in a hygienic environment.
Chanting of vedic mantras or keertans while cooking infuse high-energy vibrations into the food.
Free meal schemes are also offered in schools, prisons and temples.
INTERNATIONAL HEADQUARTERS OF NITHYANANDA DHYANAPEETAM located near Bangalore, Asia's fastest growing city
ANCIENT BANYAN TREE
A kalpa vriksha (boon giving tree) that has manifested millions of sincere prayers till date
Body and mind are calmed and refreshed by the powerful positive vibrations here
Thousands experience miraculous healing of diseases by meditating under this tree
Lord Dakshinamurti graces the space and radiates blessings to all
FREE MEDICAL SERVICES : HEALTH WITH CARE
Fortnightly and monthly multispecialty medical camps offering all services
Weekly mobile medical services including free consultation and medicines in rural areas
A 100% free dialysis clinic with 47 dialysis machines catering to 250 patients per day in the pipeline
Free 100-bed hospital with all amenities planned for the needy
NITHYANANDESHWARA-NITHYANANDESHWARI TEMPLE
Deities of Shiva & Devi measuring 7 ½ feet in height and weighing 2 ½ tons
Deities are made out of panchaloha (combination of five metals)
A rare ancient swayambu lingam found under the banyan tree is consecrated here
Thousands gather for worship here on special occasions
DISASTER RELIEF : HELPING TO HEAL
Emergency relief to victims of natural calamities such as tsunami, earthquake, floods etc
Distribution of free through various relief measures, by offering clothes, food, water and most importantly, psychological support and trauma counseling.
NITHYANANDA LINGAM & VAIDYA SAROVAR
Majestic 21-foot shivalingam which has been made using Neva Pashana (a strong natural medicine made of healing herbs) and 1008 sacred herbs.
Water from six fountains bathes the lingam and falls into Vaidya Sarovar, the healing pool below
Even a single dip in this medicinal water can heal many diseases
nithyananda.org nithynanda.tv
Page 50
পরমপূজ্য পরমহংস নিত্যানন্দ
আজ সনাতন হিন্দু ধর্মের এক সুস্পষ্ট, রীতিসিদ্ধ, রাজনীতি উদাসীন প্রভক্তা হিসাবে স্বীকৃত
বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তিনি অচেতনার জীবন্ত অবতার বলে পূজিত।
হিন্দুদের সবচেয়ে প্রাচীন শীর্ষস্থানীয় আখাড়া মহানির্ৰাণী পীঠের তিনি এক মহামণ্ডলেশ্বর।
ইউটিউবে (youtube.com) সর্বাধিক জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক শিক্ষক হিসাবে তাঁর বিভিন্ন ভাষণ কয়েক কোটি বার দেখা হয়েছে।
তিনি ২০টির বেশী ভাষায় প্রকাশিত ৩০০টি গ্রন্থের রচয়িতা।
তাঁর ভাষণ প্রতিদিন লাইভ দেখা যায় http://www.nithyananda.tv তে, বহু আন্তর্জাতিক চ্যানেলে এবং ভিডিও কনফারেন্সিং করে।
পরমহংস নিত্যানন্দ ইনার অ্যাওয়েকেনিং প্রোগ্রাম পরিচালনা করেন।
২১ দিনের এই রূপান্তরকারী প্রোগ্রামে প্রায়োগিক শিক্ষা, শক্তিশালী পূর্নত্ব প্রক্রিয়া এবং কুণ্ডলিনী জাগরণের জন্য ২১টি শক্তিশালী দীক্ষা দ্বারা আপনার সর্বোচ্চ সম্ভাবনাগুলি উন্মুক্ত হয়।
Ebook ISBN: 979-8-88572-522-4
NITHYANANDA UNIVERSITY PRESS
নিত্যানন্দ ইউনিভার্সিটি প্রেস